উন্নয়ন

বাংলাদেশের আলোকচ্ছটা

জয়রাম রমেশ | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • শিশু উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গুজরাত বা হরিয়ানার মতো ‘ধনী’ রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেক

    শিশু উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গুজরাত বা হরিয়ানার মতো ‘ধনী’ রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে

    ছবি: প্রথম আলো

  • জয়রাম রমেশ

    জয়রাম রমেশ

বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন এর মোট দেশজ উৎপাদন বাড়া-কমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকেনি। সমাজের প্রভূত উন্নয়নে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে প্রতিবেশী বহু রাষ্ট্রকে। একে এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত বলে ভাবছেন ভারতের কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ।

ভারতের গণমাধ্যমে প্রায়ই সংবাদ-শিরোনাম হয়ে আসে বাংলাদেশের নাম। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদেশ সংবাদের শিরোনামে আসে নেতিবাচক কোনো কারণে। বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ করা এখন গণমাধ্যমের খুব প্রিয় একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, এই দেশটি গত চার দশকে নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কতদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের এই আর্থসামাজিক উন্নতি অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকা ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের তুলনায় বেশি ছাড়া কম নয়।
মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতের তুলনায় বাংলাদেশকে ‘গরিব রাষ্ট্র’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ১,৫৮৫ মার্কিন ডলার, ভারতের ৩,৪১৯। ভারতের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় অর্ধেক। ভারতের কথা বাদ দিন। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ভারতীয় রাজ্য গুজরাত ও হরিয়ানার এক-তৃতীয়াংশেরও কম (গুজরাত ৫,০৯৮ মার্কিন ডলার, হরিয়ানা ৫,৪৩৪ মার্কিন ডলার)। কিন্তু তার পরও বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভারতের এই সব বিখ্যাত ‘ধনী’ রাজ্যগুলোর তুলনায় কীভাবে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে?
শিশুদের অবস্থার উন্নয়নের কথাই ধরা যাক। শিশু উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গুজরাত বা হরিয়ানার মতো ‘ধনী’ রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে।
শিশুমৃত্যু, কিংবা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার রোধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ১৩টি বৃহত্তম রাজ্যের তুলনায় অনেক ভালো। এই বৃহৎ ১৩টি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে গুজরাত, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলো।
বাংলাদেশে কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার হারও গুজরাতসহ ভারতের কমপক্ষে ছয়টি রাজ্যের তুলনায় অনেক কম। কিছুদিন আগেই গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর রাজ্যে কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে অপুষ্টির কথা বলেছিলেন। তাঁর এই উদ্ভট কথা অবশ্য কেউই গ্রহণ করেননি।
মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে শিশুর জন্মহার ভারতের দশটি বৃহত্তর রাজ্যের তুলনায় কম। বাংলাদেশে যেখানে একজন মা ২ দশমিক ২ হারে সন্তান জন্ম দেন, সেখানে গুজরাতে একজন মা জন্ম দেন ২ দশমিক ৫ হারে, হরিয়ানায় ২ দশমিক ৩ হারে। পয়োনিষ্কাশন সুবিধার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ভারতের পাঞ্জাব, কেরালা, হিমাচল প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
এতক্ষণ যেসব পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করা হলো, সেই পরিসংখ্যানগুলো বিচার করলে এ কথা নিশ্চিত করেই বলে দেওয়া যায় যে, তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও একটি দেশ যে সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যেতে পারে, বাংলাদেশ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশ এটা প্রমাণ করেছে যে একটি দেশের জন্য জিডিপির হার বাড়ানোর চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন তার সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো।
বাংলাদেশের এই আর্থসামাজিক উন্নতির নেপথ্য কারণগুলো কী কী? এটা ঠিক যে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতি নিয়ে ভারতের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন আছে। অনেকেই মনে করে থাকেন, বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নতির পথে হাঁটছে, ভারতে তার ‘দারিদ্র্য রপ্তানি’ করে। অনেকে আবার বলে থাকেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতির এই চিত্র আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো নিজেদের স্বার্থেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে থাকে। কিন্তু আসল কথা হলো, বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ মানুষ আয়-রোজগারের জন্য ভারতে প্রবেশ করে থাকে। আর বর্তমান দুনিয়ায় একটি দেশের সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের পরিসংখ্যান ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো কারিগরিভাবেই একেবারে অসম্ভব।
তাহলে বাংলাদেশ আসলে কী করছে? সামাজিক ক্ষেত্রে এই দেশটির উন্নতির মূল কারণগুলো আসলে কী? ব্যাপারগুলো নিয়ে সত্যিই সত্যিই ভারতীয়দের আগ্রহের কোনো কমতি নেই।
সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই উন্নতিতে একটি বিষয় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে, বাংলাদেশ খুব সম্ভবত সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার মোট দেশজ উৎপাদনের একটা বড় অংশ ব্যয় করে থাকে। এটা সত্যি যে কয়েক বছর আগেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে জিডিপির অনেক বেশি অংশ ব্যয় করত।
তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশে সামাজিক খাতে অগ্রগতির নেপথ্যে কাজ করে চলেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নারীদের জন্য বিভিন্ন সহায়তাকেন্দ্র সামাজিক খাতে সচেতনতা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এই সহায়তাকেন্দ্রগুলো সেবা প্রদানেও দারুণ জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করে থাকে। এই তৃণমূল প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে কাজ করে থাকে। পৃথিবীতে বাংলাদেশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর কর্মতৎপরতা ও সাফল্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছে। এই দেশটিতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় সব অগ্রগতির নেপথ্যেই সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে আসছে বেসরকারি সংস্থাগুলো। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি সংস্থাগুলো উন্নতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হওয়ায় তারা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে যে সেবাটি পৌঁছে দিতে পারছে না, সেটা পৌঁছে দিচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এটা ঠিক, ভারতের তুলনায় হয়তো বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, কিন্তু বাংলাদেশ এই দুর্বলতার বিপরীতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যেভাবে ব্যবহার করেছে, সেটাও ভারতের জন্য একটা উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে যে কাজটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাফল্যের সঙ্গে করে যাচ্ছে, ভারতে তার দায়িত্ব গ্রাম পঞ্চায়েতি রাজের। গ্রাম পঞ্চায়েতি রাজের অধীনে রয়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ৩০ লাখ নির্বাচিত গ্রামীণ জনপ্রতিনিধি। এই জনপ্রতিনিধিদের ১২ লাখ আবার নারী। কিন্তু এই গ্রাম পঞ্চায়েতির সেবা প্রদানের মান নিয়ে রয়েছে দারুণ অসন্তোষ। কোনো পঞ্চায়েতই ঠিকমতো তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশ।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ বাড়লেই সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি হবে, এই ধারণার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি বাংলাদেশ। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ খুব বেশি মাত্রায় না বাড়িয়েও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটানো যায়। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ হয়তো ভারতের চেয়ে কম, কিন্তু তারা ভারতের চেয়ে অনেক বড় পরিসরে সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছে। দেশটি প্রমাণ করেছে, তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত্তি গোটা দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন এনে দেয়।
সহলেখক:
ভারাদ পান্ডে: ভারতের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মকর্তা এবং প্রাঞ্জল ভান্ডারী: ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার কর্মকর্তা
ইংরেজি থেকে অনূদিত
জয়রাম রমেশ, ভারত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন