সংস্কৃতি
সাংস্কৃতিক অংশীদারির পথে
-
শাবানা আজমি
-
ঢাকার আরণ্যক নাট্যদল অভিনীত ময়ূর সিংহাসন নাটকের একটি দৃশ্য
ছবি: প্রথম আলো
সংস্কৃতি বাংলাদেশের প্রাণশক্তি। ভারতের রাজ্যসভার সাবেক সদস্য ও অভিনেত্রী শাবানা আজমি নানা কাজে বহুবার এসেছেন এ দেশে। দেখেছেন এ দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ও সামাজিক উদ্যোগ। তিনি বলছেন, এখন এসেছে আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সময়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন ঘোর সমর্থক ছিলেন আমার বাবা কাইফি আজমি। তাঁর ‘বাংলাদেশ’ নামের একটি কবিতার কথা আমি এখনো মনে করতে পারি:
আমি কোনো দেশ নই,
আমাকে জ্বালিয়ে দেবে তুমি
দেয়ালও তো নই, তুমি আমাকে
নিশ্চিহ্ন করে দেবে
তুমি যে চুকিয়ে ফেলবে সে রকম
সীমান্তও নই
পাগলের স্বপ্ন আমি শুধু
শক্তপ্রাণ স্বপ্ন আমি আঘাতে
আহত আকাঙ্ক্ষার...
মুক্তিযুদ্ধের পর কত কত বছর পেরিয়ে গেছে। আমি বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে গিয়েছি বেশ অনেকবার। সেখানে গিয়ে আমি অনুভব করেছি, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্ষমতায়ন ঘটেছে। তারা তাদের অধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। ক্ষুদ্রঋণপ্রাপ্তি ও অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের কারণে মেয়েরাও সমাজে চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক পরিবারকাঠামোয় তাদের অবস্থান নিয়ে নতুনভাবে দরদস্তুর করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার শক্তিশালী সুশীল সমাজের নানামুখী উদ্যোগ সারা পৃথিবীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে।
দেশে ও বিদেশে মানুষের সামাজিক ও মানবিক কল্যাণে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সে রকম নানা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশের ব্র্যাকের ভূমিকা প্রায় পথপ্রদর্শকের। এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমি নিজেও জড়িত। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্বে এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নিঃসন্দেহে শীর্ষ পর্যায়ে। ব্র্যাক থেকে আমরা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হই, কারণ এই প্রতিষ্ঠানটিই আমাদের দেখায় কীভাবে সত্যিকারের উন্নয়নের স্বার্থে কখনো সরকারের অংশ হয়ে কিংবা কখনো প্রয়োজনে নিজে নিজে কাজ করতে হয়। গণতন্ত্রে মানুষকে অবশ্যই সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে, শুধু অক্রিয় গ্রহীতা হয়ে থাকলে চলবে না, সরকারের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থির করে দিতে হবে।
প্রতিবার বাংলাদেশে এসে এখানে যে ধরনের ভালোবাসা আমি পাই, তাতে আমি অভিভূত। আমার মনে হয় আমি যেন বাংলাদেশেরই একজন মানুষ। প্রতিবার কৃতজ্ঞতায় আমি নতজানু হয়ে পড়ি। সেই কত আগে তুমহারি অমৃতা নাটকটি বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলাম। সেই নাটকটির জন্য বাংলাদেশে আমি এখনো প্রশংসা পাই। শিল্প যে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, এ বিশ্বাস বাংলাদেশের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী মহলে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। আমার বাবা-মার কারণে আমিও এই একই ধারণায় বিশ্বাসী। আমার বাবা কবি কাইফি আজমী ও মা অভিনেত্রী শওকত কাইফি আইপিটিএর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাদের প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক মূল্যবোধের অনুরণন আমি আমার মধ্যেও টের পাই।
একটি দৃঢ় সাংস্কৃতিক অংশীদারি তৈরির জন্য আমাদের প্রয়োজন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা। আমাদের এখন প্রয়োজন যৌথ প্রযোজনার দিকে এগোনো—কী মঞ্চে, কী চলচ্চিত্রে। এতে তখন আমরা শুধু নিজেদের দেশ নয়, দেশের বাইরেও যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের মধ্যেও আমাদের দর্শকগোষ্ঠীর প্রসার ঘটাতে পারব।
আঞ্চলিক সহযোগিতার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। আমি এক শক্তিশালী স্বতন্ত্র বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি যে নিজস্ব পরিচয় নিয়ে উপমহাদেশে অন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে আবদ্ধ হচ্ছে। আমাদের পরস্পরের মধ্যে এত মিল, আমাদের উচিত এই ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করা, নিজেদের সব রকম ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া, যাতে এই উপমহাদেশ একটি সত্যিকারের বিশ্বশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
শাবানা আজমি, ভারত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






