শান্তিরক্ষা

গৌরবের অতীত আগামীর দায়িত্ব

হারভি ল্যাডসাস ও আমীরা হক | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণকারী

    জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণকারী

    ছবি: সংগ্রহ

  • হারভি ল্যাডসাস ও আমীরা হক

    হারভি ল্যাডসাস ও আমীরা হক

জাতিসংঘের বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ। পৃথিবীজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এ যেন তার সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল বাস্তবায়ন। লিখেছেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও শান্তিরক্ষা বিভাগের প্রধান হারভি ল্যাডসাস এবং জাতিসংঘের আরেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও মাঠ-সহায়তা বিভাগের প্রধান আমীরা হক।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী কার্যক্রমের মূল অংশীদার, যার আছে একটি গর্ব করার মতো ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ ভূমিকা। একুশ শতকে আমরা যে নতুন ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, সেই পরিস্থিতিতে জটিল অংশীদারিতেও বাংলাদেশের প্রতি আমাদের আস্থা অটুট রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নানা জটিল পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ১১টি শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে নারী-পুরুষ মিলিয়ে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি সদস্য কর্মরত রয়েছেন। প্রতি ১০ জন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীর মধ্যে এখন একজন বাংলাদেশি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণকারী।
শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে তার আন্তরিকতার প্রমাণ রেখে চলেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশীকারীদের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যার সদস্যরা সামরিক ক্ষেত্রের তিনটি দিকেই ভূমিকা রেখে চলেছে। এগুলো হচ্ছে কোৎ দাভোয়া (আইভরি কোস্ট) ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) হেলিকপ্টার সার্ভিস এবং লেবাননে একটি ফ্রিগেট পরিচালনা; কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও আইভরি কোস্টের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসহ ১১টি মিশনে স্থলবাহিনীর কার্যক্রম; চারটি মিশনে (কঙ্গো, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া ও দক্ষিণ সুদান) ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন এবং আইভরি কোস্ট ও লাইবেরিয়ায় দুটি ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা।
জাতিসংঘ পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আমাদের যে উদ্যোগ, সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে। এ কারণে আমরা আমাদের হাইতি মিশনে শুধু নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করতে পেরেছি।
১৯৮৮ সাল থেকে ৪০টি দেশে মোট ৫২টি শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ অংশ নিয়েছে। এই মিশনগুলোতে বাংলাদেশের এক লাখেরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আমরা সেই ১১১ জন বাংলাদেশি সেনার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাই, যারা শান্তির জন্য জীবন দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সেনা ও পুলিশ সদস্য এবং এখনো যাঁরা কাজ করে চলেছেন তাঁদের প্রতি আমরা ধন্যবাদ জানাই। আমরা ধন্যবাদ জানাই তাঁদের পরিবার-পরিজনের প্রতিও, যাঁরা অব্যাহতভাবে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে ব্যাপক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তার আলোয় বাংলাদেশ তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ও পুলিশের মধ্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের এক জোরালো সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে। বাংলাদেশের সংবিধানেই এই শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে তার সংবিধানে লিপিবদ্ধ ‘মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্ক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন’ করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিত্য পরিবর্তনশীল হুমকি মোকাবিলায় আমরা নতুন ও আরও কার্যকর যে পথ তৈরির চেষ্টা করছি, সেই সামনের দিনগুলোতেও আমরা বাংলাদেশকে বর্তমানের মতো শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক ভূমিকায় দেখতে চাই। আজকের দিনে শান্তিরক্ষার চ্যালেঞ্জ শুধু সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল যে হুমকি তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা ও এ ক্ষেত্রে নিজেদের পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা পরিষদে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি প্রধান শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা সেনা ও পুলিশের সংখ্যা কমিয়ে আনতে শুরু করেছি। এ বছরের শেষের দিকে পূর্ব তিমুরে আমাদের শান্তিরক্ষী কার্যক্রম শেষ হবে। এর মধ্য দিয়ে দশক ধরে চলা একটি জাতিসংঘ মিশনের সমাপ্তি ঘটবে। হাইতিতে আমরা আমাদের উপস্থিতি ভূমিকম্প-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। ইতিমধ্যে হাইতির সরকার নিজেদের জাতীয় পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিচার বিভাগের সক্ষমতাও বাড়াতে পেরেছে। ফলে আগামী বছর আমরা সেখানে শান্তিরক্ষীর সংখ্যা আরও কমিয়ে আনব। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে লাইবেরিয়ার সরকার তাদের অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী করছে। তারা তাদের পুলিশ ও বিচারসংশ্লিষ্ট বিভাগের সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। সেখান থেকেও আমরা আমাদের শান্তিরক্ষী কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনব। দারফুরে সহিংসতার মাত্রা ও ধরন বদলে গেছে এবং বড় ধরনের সামরিক আক্রমণকে প্রতিস্থাপিত করেছে কেবল অব্যাহত অপরাধমূলক ঘটনা। এ কারণে সেখান থেকেও আমরা সেনাসংখ্যা কমিয়ে আনছি।
তবে একই সময়ে কিছু চ্যালেঞ্জও আমাদের রয়ে গেছে, যেমন কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের মতো কিছু জায়গায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হুমকির মোকাবিলা; নতুন রাষ্ট্র হিসেবে দক্ষিণ সুদানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং অংশীদারমূলক গণতন্ত্র ও শান্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়তা করা; গত কয়েক দশকে সোমালিয়া তার শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ যেভাবে কাজে লাগিয়েছে, সে ক্ষেত্রে আফ্রিকান ইউনিয়নকে সহায়তা করা এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল বা সিরিয়ার মতো যেসব জায়গায় কিছুদিন আগ পর্যন্ত আমাদের নিরস্ত্র সামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন ছিল, সেখানে সহায়তার ডাক এলে ছুটে যাওয়ার জন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম প্রতিদিন যেসব কাজ করে যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, হামলার হুমকি থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করা; নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সরকার, মানবিক ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো যে পুনর্গঠনের কাজ করছে তাকে নির্বিঘ্ন রাখা; বিভিন্ন দেশে জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তা এবং পুলিশ বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা; নারী-পুরুষের মধ্যে সমতার ধারণা প্রতিষ্ঠাসহ মানবাধিকার রক্ষা ও মানবাধিকারের ইস্যুটিকে জোরদার করে তোলা। চারটি মহাদেশে আমরা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের ১৬টি মিশন কার্যকর রয়েছে।
বর্তমান দুনিয়ার এই জটিল ও পরিবর্তনশীল শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মূল ভূমিকা পালন করার মতো আন্তরিকতা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বাংলাদেশের রয়েছে। অতীতের অবদান ও অর্জনের জন্য আমরা জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যদের প্রতি জানাই আমাদের সালাম। আমরা জানি, সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অংশীদার হিসেবে আমরা আপনাদের ওপর নির্ভর করতে পারি।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
হারভি ল্যাডসাস, ফ্রান্স
আমীরা হক, বাংলাদেশ

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন