কুমিল্লা, ফেনী, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও বগুড়া অঞ্চলের গণিত উৎসব নিয়ে বিশেষ আয়োজন
বাজল ওই গণিতের ঘণ্টা
-
শৃঙ্খলাই গণিতের প্রাণ
-
গণিত করব জয়, নিশ্চয়ই
-
শীতকে কি ভয় করে খুদে গণিতবিদেরা?
স্কুলের পরীক্ষা আর গণিত অলিম্পিয়াডের মধ্যে পার্থক্য কী?
সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে উঠে দাঁড়াল প্রাথমিক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী রোজা। উত্তরটা যেন তার তৈরি ছিল আগে থেকে। ফোকলা দাঁতে তার উত্তরটা এমন ‘আমরা গণিত অলিম্পিয়াডে আসি ভালোবেসে। কিন্তু স্কুলের পরীক্ষায় অংশ নিই ভয়ে ভয়ে।’
এমন সব প্রশ্ন-উত্তরে জমজমাট হয়ে ওঠে এবারের গণিত উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চ কুমিল্লা। গত ২৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার উদ্বোধনী উৎসবের পরদিনই ছিল ফেনীর উৎসব। সেখানেও সকাল থেকে গণিতপাগল শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে ফেনী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠ।
কুমিল্লা আর ফেনীর পর হয়ে গেছে উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও বগুড়ার উৎসবও। দক্ষিণবঙ্গেরটাও শেষ হয়ে কালথেকে শুরু হবে মধ্যবঙ্গের আয়োজন।
আনন্দে উদ্বোধনে
কুয়াশার পর্দা পেরিয়ে কুমিল্লা উৎসবে সকাল আটটার আগেই হাজির অনেক শিক্ষার্থী। ঠান্ডায় তখন বাইরে যাওয়াই দুষ্কর। মায়ের সঙ্গে উৎসবে আসা রোহান রাফসান জানায়, ‘গণিত উৎসবে এলে আমার মনটাই ভালো হয়ে যায়। আমার ইচ্ছা ছিল এবার যেন কোনো পর্ব মিস না করি। তাই সকাল সকাল চলে এসেছি।’ সকাল নয়টার আগেই উপস্থিত কয়েক শ ছেলেমেয়ে। সাড়ে নয়টায় বেজে উঠল উৎসবের ঘণ্টা। শুরু হলো উদ্বোধনী উৎসব। শিক্ষার্থীরা লাইন করে দাঁড়ানোর পর শুরু হলো জাতীয় সংগীত। সেই সঙ্গে পতাকামঞ্চে উঠে পতাকা তুললেন অতিথিরা।
ঢাকের তালে তালে
সকালে শিক্ষার্থীদের আগমন উপলক্ষে ঢাকের বাড়িতে মুখর হয়ে ওঠে সারা এলাকা। ঢাকের তালে অনেকে দুলতে থাকে উৎসবের আনন্দে। উদ্বোধনের পর শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে এগোতে থাকে পরীক্ষা কেন্দ্রের দিকে। সবখানেই পরীক্ষার রুমে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করে একরাশ আনন্দ আর ভালোবাসা নিয়ে।
অগ্নিপরীক্ষা!
শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে যেন ডাল-ভাত খেতে বসেছে। এমন একটি ভাব সবার মধ্যে। তবে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই যেন আলাদা চিত্র। সবার চোখই তখন একপাতা কাগজে আটকে আছে। এর মাঝে কেউ আবার শুধু কলম কামড়েই সময় পার করছে। কেউ বা আবার রাফ কাগজে হিজিবিজি লিখেই যাচ্ছে। অনেককে দেখেই মনে হচ্ছে, কালি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবেই। কিন্তু কলমের কালি নয়, সবাইকে থামতে হলো সময়ের কাছে। এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট মাথা খাটিয়ে সবাই ফিরে এল বাইরের আলো বাতাসে।
প্রশ্নোত্তরে সরগরম
পরীক্ষার পর অনেকেই ঘুরে দেখল পাশের বুথগুলো। কেউ আবার বাইরে এসেও বোঝার চেষ্টা করছে নিজের উত্তরটা ঠিক হলো কি না। এরপর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। এখানে অনেকেই প্রশ্নের বাণে ভাসিয়ে তোলেন মঞ্চে থাকা শিক্ষকদের। কুমিল্লা উৎসবে প্রশ্ন ছিল এমন—‘বিগ ব্যাঙ আসলে কী?’ অথবা ‘সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল কেন নেগেটিভ হতে বলা হয়, এটা আসলে কী?’ ফেনী উৎসবে উপস্থিত ছিলেন সবার প্রিয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাই অটোগ্রাফ শিকার তো ছিলই, ছিল স্যারের কাছে নানা প্রশ্ন।
উৎসব গণিতের হলে কীহবে আগ্রহ তো সব বিষয়েই। তাই প্রশ্নোত্তর পর্বে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, মহাকাশ হয়ে শরীর কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্র কোনোটাই বাদ যায় না। এমনকি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিক নিয়েও শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা তুলে ধরে। আবার প্রধানমন্ত্রী হলে কীকরবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই শিক্ষা সংস্কার, দুর্নীতি উৎখাত এবং সবার জন্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
প্রশ্নোত্তরের সময়ে
যেই সময়টাতে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে, ঠিক সেই সময়ে একদল মগ্ন থাকে বদ্ধঘরে। একাডেমিক টিমের সমন্বয়ে এখানে চলে খাতা দেখার আয়োজন। উৎসবে শিক্ষার্থীরা একটি প্রশ্নের উত্তর দেয় নানা ঢঙে। আর তা নিয়ে খাতা দেখার কক্ষে চলতে থাকে সরগরম আলোচনা।
খাঁজকাটা, খাঁজকাটা
প্রথম পাঁচটি উৎসবের সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির একাডেমিক কাউন্সিলর তামিম শাহরিয়ার। সঞ্চালনার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসবে তাঁর কণ্ঠে কুমিরের খাঁজকাটা লেজের গল্প সবাই উপভোগ করে। বগুড়ার উৎসবে গণিত ক্যাম্পের বর্ণনা করতে গিয়ে তামিম একটি গান বিভিন্ন সুরে গেয়ে শোনান। নানা মজাদার বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিক্ষার্থীদের গণিতে নিজেদের দক্ষ করার একটি সহজ পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। তিনি জানান—গণিতে ভালো করতে হলে পাঠ্যপুস্তকের অধ্যায়ের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যগুলো প্রথমে ভালোভাবে পড়তে হবে। এরপর নিজে নিজে উদাহরণ এবং পরে অনুশীলনীর সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেসব সমস্যা পারা যাবে না সেগুলো চিহ্নিত করে এগিয়ে যেতে হবে। পরের অধ্যায় শেষ করার পর পুনরায় ফিরে এসে ওই সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়।এভাবে বছরের মাঝখানেই নিজের ক্লাসের গণিতের বই শেষ করে ফেলা যায়।
ঢাকার টিকিট বুঝে নিতে
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ছিল এক মিনিট পর্ব। আর এক মিনিট পর্ব মানেই তো পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা জানার সময়। কারণ, এক মিনিট পর্বে স্যারদের আলোচনার পরপরই গরম গরম চায়ের মতো জানিয়ে দেওয়া হয় পুরস্কার পাওয়াদের নাম। এই সময়টা শিক্ষার্থীদের দেখা যায় অন্য রকম মেজাজে। কেউ বসে বসে পায়ের তলায় মাঠের ঘাস পিষছে তো কেউ হাতের কলম কামড়াচ্ছে। একেকটি নাম যায় আর টেনশন বাড়তে থাকে অন্যদের। নিজের নামটি শুনেই ভোঁ-দৌড় মঞ্চে। এর বাইরেও অনেকের মন খারাপ, কেউ বা আবার আগামী বছরের জন্য প্রস্তুত হতে চায়। কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মালিহা নূর বলে, ‘এবার আমি প্রথম আসলাম। তবে আগামীবার ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই আসতে চাই।’
দেখা হবে বিজয়ে
সব উৎসবের বিজয়ীরা ঢাকায় জাতীয় উৎসবে যোগ দেবে। তবে, গণিত উৎসব কোনো প্রতিযোগিতা নয়। সে কারণে, উৎসবে সবাই বিজয়ীহয়। তারা যখন ফিরে যায়, নিজের স্কুলে, বাড়িতে তখন তারা এগিয়ে যাওয়ার নানা রসদ নিয়ে ফেরে। তারা জেনে যায়, দেশকে ভালোবাসতে হলে সেটিকে ময়লা করা যায় না; দেশকে ভালোবাসার জন্য প্রতিদিন মাকে খুশি করতে হবে এবং একুশ শতকের লড়াইয়ে বিজ্ঞান আর গণিত হলো দিন বদলের সত্যিকারের হাতিয়ার।
সে হাতিয়ারকে সঙ্গী করেই তারা একদিন বাংলাদেশকে সোনার বাংলা বানাবে।
জয় হোক গণিত উৎসবের।
বায়েজিদ ভূঁইয়া, হাসান ইমাম ও কাব্য আহমেদ
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






