জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
‘সুপারিশ’ দিয়ে কি নদী ‘রক্ষা’ করা যাবে?
‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১২’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের খবর বের হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। নদী দখল, ভরাট, দূষণ আর নানা প্রাকৃতিক কারণে বিলুপ্ত ও মরে যাওয়া নদীর এই দেশে জরুরি একটি আইন। আইনের শিরোনামই বলে দিচ্ছে আইনটি উদ্দেশ্য; নদী ‘রক্ষা’ এবং সে জন্য একটি কমিশন গঠন করা। এ ধরনের নানা আইনের বলে এর আগেও নানা কিছু রক্ষায় অনেক কমিশন হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের যা অভিজ্ঞতা, তা নতুন একটি কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সতর্ক ও সাবধানি হওয়ারই পরামর্শ দেয়। আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর আইনের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া স্বাভাবিক কারণেই দরকারি মনে হয়েছে।
বাংলাদেশে নদী বা পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। ৭ জানুয়ারি নদী রক্ষা কমিশন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার খবরটি দেখে এমন অন্তত পাঁচজনকে ফোন করেছিলাম এই আইনটির নানা দিক সম্পর্কে জানতে। একজন ছাড়া তাঁদের সবাই জানালেন, এই আইনের ব্যাপারে তাঁরা কিছুই জানেন না। তবে সবাই নিশ্চিত করলেন যে আইনটির খসড়া তৈরির সময় তাঁদের কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের মতামত বা পরামর্শ চাওয়া হয়নি। এ ধরনের আইন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশ ও সমাজের স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ বা মতামত নেওয়া একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। খসড়াটির প্রণেতারা তেমন কিছু করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেল না। আইনটির কথা জানার পর যাঁদের ফোন করেছিলাম, তাঁদের একজন এর প্রায় সপ্তাহ খানেক পর ফোনে জানালেন যে আইনটির খসড়া তিনি অনেক চেষ্টা করেও জোগাড় করতে পারছেন না। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই আইনের খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও নেই।
নদী রক্ষায় একটি কমিশন গঠনের আইনটি এমনিতে হয়নি। এ জন্য পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির যে যেমন দীর্ঘদিনের দৌড়ঝাঁপ ও আন্দোলন-সংগ্রাম রয়েছে, তেমনি উচ্চ আদালতকে এ ব্যাপারে নির্দেশনাও দিতে হয়েছে। ‘ঢাকা মহানগরের চতুর্পার্শ্বস্থ নদী, যথা: বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা—এই চারটি নদীর দূষণ, অবৈধ দখল এবং নদীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে স্থাপনা নির্মাণকার্য চ্যালেঞ্জ’ করে একটি রিট মামলা করেছিল হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই রিট মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘বাংলাদেশের সব নদী’ দখল ও দূষণমুক্ত, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে একটি নদী রক্ষা কমিশন গঠনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বাংলাদেশ
পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বা বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) মতো পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের দাবি জানিয়ে আসছিল।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নদী রক্ষা কমিশনের খসড়া অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও অনধিক পাঁচ সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে থাকবেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নদী বা পানিবিশেষজ্ঞ, একজন পরিবেশবিশেষজ্ঞ, নদী প্রকৌশলী বা নদী জরিপ-বিশেষজ্ঞ বা নদী ব্যবস্থাপনা-বিশেষজ্ঞ এবং একজন মানবাধিকারকর্মী বা আইনজ্ঞ। বাংলাদেশে বছর ১৫ ধরে নদী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন চলছে। পরিবেশ আন্দোলনের কোনো কর্মী কেন স্থান পাবেন না কমিশনে? বাপা এরই মধ্যে এই বিষয়টি নজরে আনার চেষ্টা করেছে। এরপর যে প্রশ্নটি হাজির হয় তা হচ্ছে, কমিশনের এই সদস্যদের বাছাই করবেন কারা? খসড়ায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আটজন সচিবের উল্লেখ রয়েছে, ‘যাদের মধ্য থেকে ০৬ (ছয়) সদস্য সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হইবে’ (৭. বাছাই কমিটি) এবং এই কমিটি ‘চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ’ করবেন। আমরা প্রশ্ন করতে পারি: ছয়জন আমলার হাতে এ ধরনের একটি কমিশন গঠনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত? কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের বাছাইয়ের জন্য পুরো কমিটিকে আমলানির্ভর না করে নদী বা পানিসংক্রান্ত একাধিক বিশেষজ্ঞকে নেওয়া কি জরুরি ছিল না!
খসড়া আইনে ‘কমিশনের কার্যাবলি’ শিরোনামে ১২টি কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে। এই ১২টি কাজই হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ দেওয়া। ফলে এটা স্পষ্ট যে এই কমিশনের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। আমাদেরও প্রশ্ন, যে কমিশনের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তারা নদীকে রক্ষা করবে কিসের ওপর ভিত্তি করে! আর নদী বিষয়ে এই কমিশন যে পরামর্শ ‘সরকারকে’ দেবে, সেটা বাস্তবায়িত হবে কাদের মাধ্যমে? সামগ্রিকভাবে নদী, নদীর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়গুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নদী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক দেখার জন্য সরকারের ১৪টি কর্তৃপক্ষ ও সংস্থা রয়েছে। ফলে আমরা অনুমান করতে পারি, কমিশন নিয়মিত নানা পরামর্শ দিয়ে গেলেও নানা মন্ত্রণালয় ও সংস্থার চক্করে পড়ে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ডেইলি স্টার পত্রিকার এক প্রতিবেদন বলছে, নদীসংক্রান্ত সরকারের যেসব কর্তৃপক্ষ ও
সংস্থা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম সমস্যা রয়েছে। (৮ জানুয়ারি, ২০১৩)
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। তবে এই সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ১৮(ক) ধারাটিকে দেশের পরিবেশ সংরক্ষণের বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মানতে হবে। ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন ও প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বিধান করিবেন।’ (অনুচ্ছেদ ১৮-ক। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন)। এখানে আলাদাভাবে ‘নদী’ শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও পানি ধারণ করে এমন সবকিছুই জলাভূমির আওতায় পড়ে। বহমান পানি, আটকে থাকা পানি—সবই জলাভূমি। ফলে নদী, খাল-বিল, হাওর থেকে শুরু করে পুকুর—সবই জলাভূমি। ফলে শুধু হাইকোর্টের রায় নয়, সংবিধানেই নদী সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নদী বিষয়টির ব্যাপকতা অনেক। এটা আমাদের বুঝতে হবে যে নদী রক্ষার বিষয়টি শুধু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। নদীতে নৌ চলাচল ও কিছু ঘাট ব্যবস্থাপনা ও ইজারা দেওয়ার মধ্যেই এর কাজ সীমাবদ্ধ। ফলে তাদের উদ্যোগে ‘সুপারিশ’ দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নদী রক্ষা কমিশন গঠন আরেকটি গতানুগতিক সরকারি প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হবে, এমন আশঙ্কাই স্বাভাবিক। কমিশনে আইনের যে খসড়া হয়েছে, সেটা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ ধরনের একটি সুপারিশমূলক কমিশন নানা কারণে চরম বিপন্ন বাংলাদেশের নদীগুলোকে রক্ষায় কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে, সে প্রশ্ন রেখেছিলাম নদী ও পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের কাছে। ‘আমাদের যা বিবেচনায় নিতে হবে তা হচ্ছে, বর্তমানে নদী রক্ষায় যেসব আইন রয়েছে সে ক্ষেত্রে ও এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি হয় কি না। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন। পরামর্শ দেওয়ার লোক বা প্রতিষ্ঠানে কোনো অভাব নেই। প্রস্তাবিত নদী রক্ষা কমিশন যদি শুধু একটি পরামর্শ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হয়, তবে তা নদী রক্ষায় কী ভূমিকা পালন করবে, সেটা এক বড় প্রশ্ন। দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর রয়েছে, তাদের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, নদী রক্ষায় কিছুটা হলেও তারা ভূমিকা পালন করছে। আমার তো এখন ভয় হচ্ছে, এ ধরনের পরামর্শমূলক নদী রক্ষা কমিশন গঠনের পর না পরিবেশ অধিদপ্তরও নদী রক্ষায় তাদের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।’
আগেই বলেছি, নদী একটি ব্যাপক বিষয়। নদীর দখল-দূষণ যেমন আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়, তেমনি নদীকে আমরা কীভাবে দেখতে চাই, সেটাও আধুনিক যুগে একটি বড় বিবেচনা। প্রাকৃতিক এই বহমান পানিকে প্রকৃতির বিবেচনাতেই দেখার যে আধুনিক দর্শন, সেটা বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। নদীর মুক্তপ্রবাহ, এর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী, নদীকেন্দ্রিক নানা বাণিজ্যিক বিষয়, স্থাপনা নির্মাণ—এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিকভাবেই নদীকে দেখতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী, আমরা যদি ‘ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য’ পরিবেশ বা জলাভূমি সংরক্ষণ করতে চাই, তবে নদীবিষয়ক একটি সমন্বিত ও একই সঙ্গে একক কর্তৃপক্ষ গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ও এর সঙ্গে নদীকে মিলিয়ে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ এবং সেসব নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁদের থাকবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনের ব্যাপারে বাপা তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, প্রতিষ্ঠানটি ‘কমিশন’ না হয়ে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কর্তৃপক্ষ’ হওয়া উচিত ছিল। আমাদের কথা হচ্ছে, কমিশন বা কর্তৃপক্ষ যে নামেই হোক—নদীকে ‘রক্ষা’ করাই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ক্ষমতা থাকার বিষয়টি খুবই জরুরি।
আইনটি যেহেতু খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, তাই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের এই চেষ্টা। সরকারের দৃষ্টিশক্তির অবস্থা কী, সেটা অবশ্য ভিন্ন বিবেচনা।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com







Tajerul islam sadhin
২০১৩.০১.২৭ ০৮:৫৬Tajerul islam sadhin
২০১৩.০১.২৭ ০৮:৫৭Mohammad Shah Alam
২০১৩.০১.২৭ ০৯:১৯