মূল প্রতিবেদন
বাজেটে শিশুরা উপেক্ষিত
জাতীয় বাজেটে শিশুরা উপেক্ষিত। দেশের মোট বাজেটের কত অংশ শিশুদের জন্য বিনিয়োগ করা হচ্ছে বা হওয়া উচিত, সরকার বা অর্থনীতিবিদদের কাছে তার স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। বাজেটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশুর উন্নয়নে বরাদ্দের পরিমাণ, বরাদ্দের কত অংশ শিশুর উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, তা জানা যাচ্ছে না।
শুধু জাতীয় বাজেটে নয়, পরিবারের জন্য বাজেট বরাদ্দেও শিশুরা উপেক্ষিত। বিশেষ করে, দরিদ্র পরিবারের শিশুর দিকে বাজেট বরাদ্দে সরকার বা পরিবার কেউই নজর দিচ্ছে না।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা পাঁচ কোটি ৬০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হ্রাস, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, বিনা মূল্যে বই বিতরণ, প্রাথমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা অর্জনসহ শিশুর উন্নয়নে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ নজির সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পুষ্টি কার্যক্রম, শিশুবিকাশ কেন্দ্র, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, পথশিশুর উন্নয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও চলমান। তবে এখনো মোট শিশুর অর্ধেকের কাছাকাছি দরিদ্র। ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট-বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, পুষ্টির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। গত বাজেটের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কন্যাশিশুদের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম এখনো শুরু করতে পারেনি সরকার।
গ্রামাঞ্চলসহ দলিত সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুরা সমান সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন বলছে, প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে শিশুর বিনোদনের বিষয়টি এখনো গুরুত্ব পায়নি। শিশু পাচার, যৌন হয়রানি ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হাত থেকেও শিশুরা রেহাই পাচ্ছে না। এ ধরনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিশুর পূর্ণ বিকাশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনসহ সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের পেছনে বিনিয়োগ করা মানে হচ্ছে, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা। সরকারকে এদিকে মনোযোগ দিতেই হবে।
শিশুদের দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার বলা হলেও বাজেটে শিশুদের জন্য কত বিনিয়োগ করা হচ্ছে বা প্রয়োজন, এ নিয়ে এখনো তেমনভাবে গবেষণা হয়নি। জাতীয় বাজেট পাসের আগে সরকারি উদ্যোগে শিশুদের সঙ্গে আলোচনাও করা হয় না। ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট-বক্তৃতাতেও শিশুদের অস্তিত্ব খুঁজে বের করা কঠিন। বাজেট-বক্তৃতার ২১১ নম্বর পৃষ্ঠায় নারী ও শিশু কল্যাণের প্রসঙ্গে আলাদাভাবে শিশুর বিষয়টি এসেছে। এতে এতিম শিশু, অটিজম স্কুল, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তিসহ খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে শিশুর বিষয়টি এসেছে।
নীতিনির্ধারণকারীদের চিন্তায়ও শিশুর জন্য বিনিয়োগের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে শিশুদের জন্য আসলেই কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, তা স্পষ্ট না হলে কোন কোন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, তা-ও বলা যাচ্ছে না। বর্তমান বাজেট কাঠামোতে নারী ও শিশু বা মা ও সন্তানকে এক করে ফেলায় শিশুদের হিসাবটি বের করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন খাতে মোট ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এ বরাদ্দে শিশুর অংশ নির্দিষ্ট করা নেই বা জানার উপায় নেই। সরকারের ২০১১ সালের জাতীয় শিশু নীতিমালায় বলা হয়েছে, জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এ কথা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বিষয়টিতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শিশুর উন্নয়নে প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত এ মন্ত্রণালয়ের ২০১১-১২ অর্থবছরে এক হাজার ২৪১ কোটি টাকার মোট বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়। প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বরাদ্দের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় এ হিসাব বের করেছে।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার পেছনে খরচের পর শিশুদের জন্য আর তেমন কিছু বাকি থাকে না। গ্রামীণ দুস্থ নারীদের খাদ্য সহায়তাসহ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ভিজিডি কার্যক্রমেই মন্ত্রণালয়ের ব্যয় হচ্ছে মোট বাজেটের সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা।
গত ডিসেম্বরে ইউনিসেফ এবং উন্নয়ন সমন্বয় আয়োজিত এক সেমিনারে শিশুর জন্য জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এ সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে শিশুপ্রতি নামিক (নমিনাল) ও প্রকৃত বরাদ্দের পার্থক্য অনেক বেশি। পুষ্টির বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের পর থেকে যে হারে দারিদ্র্য দূর হয়েছে, সে হারে শিশু অপুষ্টির হার কমেনি। এতে শিশুর পুষ্টির উন্নয়নে বিশেষায়িত বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় বাজেটের প্রবৃদ্ধির ধারা ঊর্ধ্বমুখী হলেও মোট বাজেটের শতাংশ হিসাবে শিক্ষা খাতে বাজেটের অংশের পরিমাণ নিম্নমুখী।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে সরকারি হিসাবেই দেশের ৫০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। এ ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষায় বিনিয়োগ করে লাভ হবে না। কেননা, এই অপুষ্ট শিশুরা স্কুলে টিকে থাকতে পারবে না।
প্রয়োজন কাঠামো: সরকারের আর্থিক খাত সংস্কার-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো-পদ্ধতিতে বর্তমানে সব মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের বাজেট পরিপত্র ১-এর মাধ্যমে এ কাঠামোতে মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট বরাদ্দের কত অংশ নারী উন্নয়ন, কত অংশ দারিদ্র্য নিরসনে ব্যয় করা হবে, তা নির্ণয় করা হয়। জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেট প্রণয়নকে বিবেচনা করেই অর্থ বিভাগ পরিপত্রটি জারি করেছে। জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেট-প্রক্রিয়ায় দুই গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন চাহিদার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স অ্যাসেম্বলির চেয়ারপারসন ইমরানুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সরকারকে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনের মতো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শিশুদের জন্য বাজেট প্রণয়নের দাবি জানানো হচ্ছে বহুদিন ধরে। একই সঙ্গে শিশুর উন্নয়নে যেটুকু বাজেট বরাদ্দ করা হচ্ছে, তা-ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
তবে ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশুবান্ধব বাজেট কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরিবারেও উপেক্ষিত: রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশে বস্তিতে বাস করা নৌফুল বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে এক মেয়েকে ১১ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। অন্য দুজনের কেউই স্কুলে যায় না। মাসে এক দিন মাংস খাওয়ার সুযোগ পায় পরিবারটি। নৌফুল বলেন, ‘পুলাপানরে স্কুলে ভর্তি করতে চাইলে বেতন চায় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। সরকারি হাসপাতালে গেলেও বাইরে থেইক্যা ওষুধ কিনতে বলে।’ মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি বস্তির শামীমা জানান, সাড়ে চার বছরের মেয়েকে ভালোমন্দ খাওয়াতে গেলে প্রয়োজনীয় কিছু একটা কাটছাঁট করতে হয়। তাই সব সময় এটা করা হয় না।
২০১০ সালের জুন মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০০৯’ অনুযায়ী, বস্তি এলাকার মাত্র ৬৫ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, যেখানে অন্যান্য এলাকায় এ হার ৮৪ শতাংশ। বস্তিতে ৪৮ শতাংশ শিশু পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত টিকে থাকছে। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হচ্ছে মাত্র ১৮ শতাংশ, যা অন্যান্য এলাকায় ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ, সব শিশুর চাহিদা এক নয়, সে হিসাবে শিশুর চাহিদাকে মাথায় রেখে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। শিশুবান্ধব বাজেট কাঠামো প্রণয়নও সময়ের দাবি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






