বাজেটে বরাদ্দ কম
বেহাল শিক্ষাব্যবস্থা
বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় বরগুনার আমতলী উপজেলার হরিদ্রাবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এভাবে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করা হয়
রাজধানীসহ সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে বেহাল দশায় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ সীমিত বাজেট দিয়ে বিদ্যালয়গুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারছে না। এছাড়া রয়েছে শিক্ষকের সংকট। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষার মান আশানুরূপ হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে এমন চিত্রই পেয়েছেন।
রাজধানীর মিরপুরের শিশুমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়ালে কবে শেষ কবে রং পড়েছে, তা আর কারও মনে নেই। শ্রেণীকক্ষগুলোর জীর্ণদশা। শিক্ষার্থী অনুপাতে বসার বেঞ্চ নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোর অবস্থাও নড়বড়ে। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে । বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গত সাত বছরে এই বিদ্যালয়ে নতুন কোনো বেঞ্চ দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন,‘ বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য আমরা যে বরাদ্দ পাই, তা দিয়ে সংস্কারকাজ করা যায় না। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলে এমন বিদ্যালয়ের আমূল পরিবর্তন সম্ভব।’
রাজধানীর পীরেরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিচু এলাকায়। বর্ষাকালে এই বিদ্যালয়ের কয়েকটি শ্রেণীকক্ষে পানি ঢোকে। পানি সরিয়ে ক্লাস নিতে হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ভবনগুলো পুরোনো হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল আজিজ বলেন, ‘বেশি বৃষ্টি হলেই বিদ্যালয়ে পানি ঢোকে। তখন আমাদের সবার ভোগান্তি হয়। সরকারি বিদ্যালয় হলেও সরকারের এদিকে কোনো নজর নেই।’ এ ছাড়া এই বিদ্যালয়ের দরজা-জানালা ও বেঞ্চ সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের হরিদ্রাবাড়িয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন দেড় বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়। দেড় বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুকনো মৌসুমে খোলা আকাশের নিচে এবং বর্ষায় আশপাশের বিভিন্ন ভবনে পাঠদান করা হচ্ছে।
টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলম মল্লিক বলেন, ২০১১ সালের জুলাই মাসে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় ভবনগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস না নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভবন মেরামত বা নতুন ভবন তৈরির জন্য কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ে এসে এভাবে কষ্ট করার কারণে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোনিবেশ করতে পারছে না । অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে।
আমতলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেসমিন আখতার বলেন, উপজেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয়েই অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর ভবন নির্মাণ, মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার উন্নয়নে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উক্তিয়ারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে পড়ে। এর পর থেকে এই বিদ্যালয়ে পাঠদান চলে আসছিল খোলা আকাশের নিচে। ২০০৯ সালে অভিভাবকদের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন থেকে আধা কিলোমিটার দূরে একটি টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়। এখানে বিদ্যালয়ের ১৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৫০ জন কোনো রকমে বসতে পারে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রোকেয়া আক্তার জানান, বিষয়টি লিখিতভাবে প্রতিবছরই উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়কে অবহিত করে আসছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। তিনি বলেন, সরকার অনেক বিষয়ে নজর দিলেও গ্রামগঞ্জের বিদ্যালয়ের ব্যাপারে নজর কম। তিনি বলেন, সরকারের উচিত শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো।
তাহিরপুর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ২৪৯টি গ্রামের মধ্যে ১৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টি বিদ্যালয়ে নলকূপ এবং ৫০টি বিদ্যালয়ে শৌচাগার নেই। এ ছাড়া ১০টি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর অবস্থা খুবই খারাপ। বৃষ্টি হলে এসব বিদ্যালয়ের ভবনের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে ছাতা নিয়ে বসতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে এসব বিদ্যালয়ের আসবাব ও অফিসকক্ষের কাগজ, চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে সহকারী শিক্ষকেরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পাঠদান করতে পারছেন না। এ ছাড়া অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তাই লেখাপড়ার মান আশানুরূপ হচ্ছে না।
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের প্রতিটি কক্ষ জরাজীর্ণ। কক্ষের ছাদ ও বিম থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। ভেঙে পড়েছে দরজা-জানালা। কিছুদিন আগে প্রথম শ্রেণীর ক্লাস চলাকালে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হয়। এর পর থেকে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে চলছে ওই বিদ্যালয়ের লেখাপড়া। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল ওয়াহাব তালুকদার বলেন, স্কুলের শিশুদের দুর্দশার চিত্র উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দেখে গেছেন। কিন্তু এখনো এর সংস্কার হয়নি।
নড়াইলের লোহাগড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা কক্ষের অভাবে খোলা আকাশের নিচে বসে ক্লাস করে। শিক্ষার্থীরা জানায়, খোলা জায়গায় রোদের মধ্যে ক্লাস করতে ভালো লাগে না। বেঞ্চ না থাকায় লেখা যায় না। শ্রেণীশিক্ষক রানী বালা মজুমদার বলেন, ‘খোলা জায়গায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়। চারপাশে অভিভাবকেরা দাঁড়িয়ে থাকেন। এই অবস্থায় সঠিকভাবে পাঠদান সম্ভব নয়।’
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০টির অবস্থা জরাজীর্ণ। বিদ্যালয়গুলোর দরজা-জানালা ভাঙা, ব্ল্যাকবোর্ড নষ্ট, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বসার টেবিল-চেয়ার এবং বেঞ্চ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অধিকাংশ কক্ষের পলেস্তারা খসে পড়েছে, বৃষ্টি হলে ভবনের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, মেঝের মধ্যে গর্ত হয়ে গেছে। আর এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রমেন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। যে কারণে শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে সমস্যা হয়।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মোছাব্বের হোসেন, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি খাইরুল বাশার, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি গোলাম সরোয়ার, পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি মকবুল হোসেন , ফুলপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি এনামুল হক, লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি মারুফ সামদানী , ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি সাদেকুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি (রামগড়) প্রতিনিধি শ্যামল রুদ্র।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






