এক দিন
‘ফল তো বড়লোকের পোলাপাইনের খাওন’
হিউম্যান হলারে নিজের কাজে ব্যস্ত সজীব
‘এক প্লেট ভাত, এট্টা ভর্তা, এক বাডি ডাইল আর এট্টা কাঁচা মরিচ, এট্টা ভাজা মরিচ।’
দাপটের সঙ্গে খাবারের ফরমাশ দিয়ে হাজারীবাগ ভ্রাম্যমাণ ভাতের হোটেলের (ভ্যান) পাশে রাখা ড্রাম থেকে এক মগ পানি উঠিয়ে হাতটি ধুয়ে খেতে বসে যায় ছোট্ট ছেলেটি।
নাম কী তোমার?
আশপাশে তাকিয়ে বলল, ‘আমারে জিগাইলেন?’
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ-সূচক সায় দিতেই ঝটপট উত্তর, ‘সজীব। বয়স ১৩ বচ্ছর। গাড়ির (হিউম্যান হলার) হেলপার। হেলপারি করি দুই বচ্ছর। ডিউটি করি ভুর ছয়ডার তন রাইত ১২টা পর্যন্ত। কাম করতে এহন আর কষ্ট অয় না। তয় শীত তো, সকালে ঘুম থেইক্যা উডতে মন চায় না, কিন্তু তা-ও ওডন লাগে। দেরি হইলে আবার ওস্তাদে চেইতা ওডে। কয়, এই রহম করলে নতুন হেলপার লইব।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে আরেক নলা ভাত মুখে দেয় সজীব।
আমি তো এত কিছু জানতে চাইনি..., কথা শেষ না হতেই মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে বলে, ‘গাড়িতে আফারা এইগুলাই জিগায় তো; ভাবলাম, আপনেও জিগাইবেন। তাই আগেই কয়া দিলাম।’
জানতে চাইলাম, এখানেই কি সব সময় খাও?
‘গাড়ি ট্রাবল দিছে, ওস্তাদ ঠিক করতাছে। ভাতের গাড়ি দেইখ্যা ভাবলাম, দুইডা খায়া লই। সব সময় না, তয় মাজেমদ্যেই খাই। এইহানে খাইলে ট্যাকা কম লাগে। আর বাড়িত তো শাক-তরকারি ছাড়া কিছু রান্ধে না।’
কেমন খরচ হয় এখানে খেতে?
‘১৫-২০ ট্যাকা লাগে। তয় যেদিন ডিম খাই, হেদিন বিলডা এট্টু বেশি অয়।’
ফল-টল বা অন্য কোনো খাবার খাওনা?
‘কন কী আফা, ফল তো বড়লোকের পোলাপাইনের খাওন।’
পড়ালেখা করেছ?
এতক্ষণ কথার তুবড়ি উড়িয়ে চললেও এবার আর কথা বলে না সজীব। মাথা না তুলেই ভাত খাচ্ছে। ঠিক খাচ্ছে বলা যায় না, গিলছে।
কী, কথা বলবে না?
হাস্যোজ্জ্বল মুখটি মলিন হয়ে যায়। থমথমে গলায় উত্তর, ‘মায় কইছে, ভাত খাওনের সময় বেশি কতা কওন ভালা না।’
ঠিক আছে, খেয়ে নাও, আমি অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করার সময় খেয়াল করি, ছেলেটির হাত-পায়ে ধুলা, মাথার উষ্কখুষ্ক চুলে ময়লা ভর্তি, ফাটা ঠোঁটের দুই পাশে দগদগে ঘা। সেগুলো চুলকে রক্ত বের করেছে। মুখভর্তি নখের আঁচড়। শরীরের, এমনকি নখগুলোর ওপর ময়লার কালো একটা স্তর।
খাওয়া শেষে একটা চা নিজের জন্য আরেকটা চা এই প্রতিবেদকের জন্য নিয়ে এসে মাটিতে বসে পড়ে। এরপর নিজে নিজেই বলতে শুরু করে, ‘স্কুলে গেছিলাম, তয় এক বছর পইড়া আর পড়ি নাই।’
পড়োনি কেন?
‘বাজানের জন্টিস হইছিল, না বাঁচনের মতো অবস্থা। কামে যাইতে পারত না। আমরা তিন ভাই, বাপ-মায়ে আর দাদি-ফুফু মিইল্যা সাতজন মানুষ। মার কামাইতে সংসার চলত না। তহন আমারে মায় দোকানে কামে দিল। তয় বাপের অসুখ সারলে আবার পড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তুক পড়াতে আর মন বহে নাই। দোকানে কাম করতাম আর ফাঁক পাইলেই মার্বেল খেলতাম। এহনো খেলি। সপ্তায় আমার এক দিন ছুটি, হেই দিন সারা দিন খেলি। জানেন আপা, আমার তেরো শ মার্বেল আছে।’
তোমার বাসা কোথায়?
অদূরে নদীর দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে, ‘আমি কামরাঙ্গীচর থাহি। আর ঘাবতলী (গাবতলী) টু সিকশন (হাজারীবাগ) রোডে কাম করি।’
প্রতিদিন আয় কত হয়?
‘তা খারাপ না। ২০০-৩০০ ট্যাকার মতো। ১০-২০ ট্যাকা নিজে রাইখ্যা বাকিটা মায়রে দেই। মায়রে কইছি ট্যাকা জমাইতে। ট্যাকা দিয়া একটা গাড়ি কিনমু। আর হেই গাড়ির ওস্তাদ (চালক) থাকমু আমি। তহন ডেইলি ডিম দিয়া ভাত খামু আর শীতকালে দেরি কইরা ঘুম থেইক্যা উডমু।’
এর মধ্যে তাড়া দেন ওর গাড়ির চালক। ‘আফা, যাই’ বলে হলারের পাদানিতে কোনোমতে পা দুটো ফেলেই হাঁক দেয়, ‘এই গাবতলী টু সিকশন!’
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






