খাদ্য তথ্যবিভ্রাট-২
চার সংস্থার চালের দর চার রকম
ধানের উৎপাদন ও চালের ভোগ নিয়েই কেবল তথ্যবিভ্রাট ঘটছে এমন নয়, ধান-চালের বাজারদর নিয়েও রয়েছে বিস্তর বিভ্রান্তি। সরকারের চারটি সংস্থা চালের বাজারদর সংগ্রহ করে। চারটি সংস্থাই চার ধরনের বাজারদর দেখায়। ওই দর দেখেই সরকার খাদ্যনিরাপত্তায় নানা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। অথচ সরকারি সংস্থার দেওয়া দরের চেয়ে রাজধানীর প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। যেমন: বেশির ভাগ সরকারি সংস্থার হিসাবে বাজারে মোটা চালের দাম ৩০ টাকার নিচে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কোনো বাজারেই ৩০ থেকে ৩৪ টাকার নিচে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে না।
ওই চার সরকারি সংস্থাই তাদের মাঠপর্যায়ের জনবল দিয়ে ওই বাজারদর সংগ্রহ করে থাকে। প্রতিটি সংস্থা তাদের সংগ্রহ করা বাজারদরকে সঠিক ও অন্যদেরটা ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের বাজারদরের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি অন্যান্য সংস্থায় পাঠায়। কিন্তু দরের পার্থক্য কেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হয়নি।
চালের দাম বাড়লে বা দরিদ্র মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেলে সরকার খোলাবাজারে ভর্তুকি মূল্যে চাল বিক্রি এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করে। দেশের খাদ্যবিষয়ক নীতিমালা ও বিধিমালায় এমনটাই বলা আছে। কিন্তু চালের দরের এই পার্থক্য সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ড. মাহবুব হোসেন এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই ধান-চালের সঠিক দর জানা প্রয়োজন। এতগুলো সংস্থা একযোগে যে তথ্য সংগ্রহ করে, তাতে ভিন্নতা থাকলে সরকারের খাদ্যনিরাপত্তা-বিষয়ক পদক্ষেপগুলোও সঠিক হবে না। সরকারের উচিত দ্রুত এগুলোর জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা। আর কৃষকের স্বার্থের কথা চিন্তা করলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকেই ধান-চালের দর পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের চাল উৎপাদনকারী দেশগুলো অবশ্য চালের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সে দেশের কৃষি বিভাগের সহায়তা নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে মানভেদে চালের দর নির্ধারিত হয়। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারত চালের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে চালের দর নির্ধারণ করে। সাধারণ চাল ও সুগন্ধি চাল—এই দুই ভাগে ভাগ করার পর ওই চালের মধ্যে কত শতাংশ ভাঙা চাল রয়েছে, সেই হিসাব করে তারা চালের দাম নির্ধারণ করে। যেমন: ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ বা ২৫ শতাংশ চাল ভাঙা থাকলে সে অনুযায়ী দর নির্ধারিত হয়।
দেশে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা মোটা, মাঝারি ও সরু—এই তিন ধরনের চালের দর দিয়ে থাকলেও তার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো নেই। সরকারি সংস্থাগুলো নিজেদের মতো করে চালের মানভেদে দর সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর ধান-চালের দর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতেই গলদ আছে। কেননা একই বাজারের বিভিন্ন দোকানে একই চালের দর একেক রকম হতে পারে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ চাল উৎপাদনকারী দেশগুলো চালের মান অনুযায়ী গ্রেডিং পদ্ধতিতে দাম পর্যবেক্ষণ ও নির্ধারণ করে থাকে। বাংলাদেশেও সুনির্দিষ্ট মানভিত্তিক গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করে দাম পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নয়তো এই ভুলের বৃত্ত থেকে বের হওয়া যাবে না।
চার ধরনের দর: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের বাজারদর ৩০ থেকে ৩২ টাকা। গত এক মাসে মোটা চালের সর্বনিম্ন দর কেজিতে দুই টাকা বা ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে প্রতিকেজি মোটা চালের দর ২৮ থেকে ৩২ টাকা। তাদের মতে, প্রতিকেজি চালের পাইকারি দর ২৩ থেকে ২৬ টাকার কিছুটা বেশি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঢাকা রেশনিং বিভাগ রাজধানীর ১২টি বাজারের চালের দর পর্যবেক্ষণ করে দৈনিক প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ তারিখ রাজধানীতে প্রতিকেজি চালের পাইকারি দর ছিল ২৬ থেকে ২৯ টাকা। তারা চালের পাইকারি দর উল্লেখ করেছে ২৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২৬ টাকা ৫০ পয়সা।
আবার সরকারের খাদ্যবিষয়ক নীতি ও কৌশল প্রণয়ণ সংস্থা খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, এক মাস ধরে রাজধানীর মোটা চালের দর ২৯ টাকায় স্থির ছিল।
কিন্তু রাজধানীর কোনো বাজারেই ৩০ টাকার নিচে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে না। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, পুরান ঢাকার কাপ্তানবাজারসহ বেশির ভাগ বাজারে প্রতিকেজি মোটা চাল ৩২ থেকে ৩৪ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ঢাকা রেশনিংয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রক সুকুমার চন্দ্র প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের দিয়ে যে বাজারদর সংগ্রহ করি, তা-ই সঠিক।’ কিন্তু অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে দরের অমিল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অন্যরা কীভাবে সংগ্রহ করে, আমি বলতে পারব না। তবে আমরা সঠিকভাবে দর সংগ্রহ করি।’







Mohammad Shah Alam
২০১৩.০১.২৭ ০৮:৪২