নির্যাতনের করুণ কাহিনি

ভয় দেখিয়ে শিশুটি স্বামীর বলে হলফনামা

মোহামঞ্চদ শাহজাহান, হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর) | তারিখ: ৩১-০১-২০১৩

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

চাঁদপুরে ধর্ষণের পর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সেই নারীকে গৃহবন্দী করে রাখা আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে। তিনি পাঁচ লাখ টাকার লোভ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বাচ্চাটি ওই নারীর আগের স্বামীর উল্লেখ করে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে হলফনামা (এফিডেভিট) করান।
আনোয়ারের হুমকির মুখে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ‘মিথ্যা জবানবন্দিও’ দেন বলে জানিয়েছেন।
শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোজামেঞ্চল হক মামুন বলেন, ‘ওই নারীকে নিয়ে প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশের পর মামলার নথিপত্র দেখেছি। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বাদীর জবানবন্দি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ আসামির পক্ষে গেছে। এ কারণেই তদন্ত কর্মকর্তা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন।’
ওই নারীর ওপর নির্যাতন ও তাঁর শিশু ছেলেকে ফিরে পাওয়ার ঘটনা নিয়ে ১৯ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘নির্যাতনের করুণ কাহিনি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি পড়ে ওই নারীকে আইনি সহায়তা দিতে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আইনজীবীরা ওই দিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার আলীগঞ্জের বাসায় যান। পরে তাঁরা ওই নারী ও তাঁর শিশু ছেলেকে তাঁদের হেফাজতে নিয়ে চলে যান। বর্তমানে মা ও ছেলে ঢাকায় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন।
হলফনামায় যা আছে: গত বছরের ৩০ এপ্রিল চাঁদপুর জেলা জজ আদালতের এক আইনজীবী জেলা নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে হলফনামা করতে সহায়তা করেন। হলফনামায় বলা হয়, ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকার মো. ফারুকের সঙ্গে রেজিস্ট্রি কাবিননামা মূলে ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে ওই নারীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক মাস তিনি স্বামীর সঙ্গে থাকেন। কিন্তু শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ২০১১ সালের মে মাসে ফারুক তাঁকে শাহরাস্তি উপজেলার বাবার বাড়িতে রেখে যান। প্রতি মাসে ফারুক তাঁর কাছে এসে দু-তিন দিন থেকে চলে যেতেন। ওই অবস্থায় তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।
হলফনামার শেষাংশে বলা হয়েছে, স্থানীয় খিলা ও নোয়াপাড়া গ্রামের তিন-চারজন অপরিচিত লোক ওই নারীকে চাঁদপুরে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে মামলা করিয়েছেন। তিনি নাম স্বাক্ষর করতে পারেন, লিখতে ও পড়তে জানেন না। ওই লোকদের ভয়ে আনোয়ারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন।
তবে ওই নারী, তাঁর মা ও প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিয়ের পর তিনি দু-তিন মাস স্বামী ফারুকের সঙ্গে ছিলেন। এর পর তাঁকে বাড়িতে রেখে চলে যান স্বামী। পরে আর কোনো খোঁজ নেননি।
নির্যাতিত ওই নারীর মা বলেন, ‘আনোয়ারের লোভে পড়ে আমি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আলীগঞ্জে এসেছিলাম। সে আমাদের এত বড় ক্ষতি করবে বুঝি নাই। এখন আপনারা আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারেন।’
স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, ওই নারী লিখতে ও পড়তে না জানায় আনোয়ার মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য আইনজীবীর সহায়তায় মিথ্যা হলফনামা করান। আর নির্দোষ উল্লেখ করে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহরাস্তি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. খোরশেদ আলমকে দুই লাখ টাকা দেন। আনোয়ার প্রভাবশালী হওয়ায় ওই নারী তাঁর শিশু ছেলে, মা, ভাইবোনদের কথা চিন্তা করে হলফনামায় সই করেন।
এসআই খোরশেদ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুঠোফোন বন্ধ থাকায় আনোয়ারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ওই হলফনামা ও মামলা-মোকদ্দমায় সহযোগিতা করেন হাজীগঞ্জের আলীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও ঘনিষ্ঠজন শাহনেওয়াজ মারওয়ান। শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আনোয়ারের মামলা নিয়ে আমি আদালতে ও থানায় বহু দৌড়াদৌড়ি করেছি। আনোয়ার মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য প্রথমে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েটি ও তার পরিবারের সদস্যদের আলীগঞ্জের বাড়িতে বন্দী করে রাখেন। পরে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বাচ্চাটি আগের স্বামীর বলে হলফনামা করান। মেয়েটি পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মিথ্যা জবানবন্দিও দেন। কিন্তু আনোয়ার মেয়েটিকে বিয়েও করেননি, পাঁচ লাখ টাকাও দেননি।’

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Firoz Alam

Firoz Alam

২০১৩.০১.৩১ ১৫:৪৬
এখন ঐ শিশু সন্তান এবং আনোয়ারের ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক। তাহলে আপনিতেই বেরিয়ে আসবে ঘটনার প্রকৃত পটভূমি।