সিপিডির সংলাপে মালিকের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ
তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকের প্রাণহানির দায় মালিকের
সিপিডির সংলাপে বক্তারা
প্রথম আলো
আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিকের মৃত্যুর প্রধান দায় মালিকের। কিন্তু দুই মাস পার হয়ে গেলেও এই মালিককে সরকার গ্রেপ্তার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
‘পোশাক শিল্প শ্রমিকের কর্মকালীন নিরাপত্তা ঝুঁকি: কারণ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপে গতকাল শনিবার এই ক্ষোভ প্রকাশ পায়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই সংলাপের আয়োজন করে। এতে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম তীব্র ভাষায় তৈরি পোশাক মালিক সমিতি বিজিএমইএর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই সমিতির কাজ হলো মালিকদের রক্ষা করা। নিজেদের করমুক্তি, ভ্যাট কমানোসহ সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায়।
সাংসদ বলেন, ১১২ জন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। আর বিজিএমইএ তাঁকে রক্ষা করতে তদন্ত কমিটি করেছে। তিনি বলেন, বিজিএমইএর তদন্ত কমিটি উদ্দেশ্যমূলক, একপেশে। শুধু মালিককে হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে এই কমিটি গঠন করেছে তারা। তিনি বলেন, কোনোদিনই পোশাকমালিকেরা কোনো দুর্ঘটনার দায়িত্ব নেননি। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বলেন, সর্টসার্কিটে ঘটেছে। কিন্তু তাঁদের বাসায় কোনোদিন সর্টসার্কিট হয় না। বিজিএমইএতে কোনো সর্টসার্কিট হয় না।
ইসরাফিল আলম বলেন, যদি অগ্নিকাণ্ডে হত্যার দায়ে বিচার না হয়, দায়ীদের আইনের আওতায় না আনা যায়, তাহলে এই খাতে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। অবশ্য আমেরিকাতে জিএসপি বাতিলের উদ্যোগসহ বিশ্বব্যাপী যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে তাতে এ খাতের ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে শঙ্কা আছে। তিনি বলেন, পোশাক খাতকে মৃত্যুকূপ বানানো চলবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, তাজরীনের অগ্নিকাণ্ড কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ। রোগের চিকিৎসা না হলে উপসর্গ হতে থাকবে। রোগের জায়গাটা হলো আর্থসামাজিক উন্নতি হয়নি। সামাজিক শক্তির ভারসাম্য সামনে না এলে মনোভাবের পরিবর্তন হবে না। অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থার কারণে তাজরীনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এর দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। মালিককে আইনের আওতায় নিতে হবে। শাস্তি না হলে নতুন ঘটনা বন্ধ হবে না। শ্রমিক সংঘ করার দাবি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এখানে করা যাবে না এই অজুহাত বিদেশে দেওয়া যাবে না। দেবপ্রিয় আরও বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ নিজেদের উদ্যোগেই করতে হবে, বিদেশিদের ডেকে এনে নয়।
এর আগে শ্রম মিকাইল শিপার বলেন, তাজরীনে ৫৩টি লাশ শনাক্ত করা যায়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমি জানি না কেন সব আশ্চর্যজনক ঘটনা পোশাক খাতে ঘটে? ৪৭ জনের ডিএনএ টেস্ট করতে হয়।’ ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এর রিপোর্ট পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
মিকাইল শিপার আরও বলেন, ‘আইন না মানা আমাদের একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাঁদের কাছে মানার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা আইন মানেন না। অবশ্য বিদেশিরা আইন মানে।’
শ্রমসচিব জানান, শ্রমমন্ত্রীর নেতৃত্বে পোশাক খাতের সব আইনকানুন এক মন্ত্রণালয়ে আনার বিষয়ে ১১ জন মন্ত্রীর একটি কমিটি হচ্ছে। তাদের সুপারিশ অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শ্রমিকনেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, অনেক আইনকানুন হয়েছে। তদন্ত কমিটি, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়েছে। কোনো শাস্তি হয়নি। সরকারিভাবে যখন বলা হয় ষড়যন্ত্র, তখন কার ক্ষমতা আছে এর বিপরীতে মত দেওয়া। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র প্রমাণ করা না যাবে, ততক্ষণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটির কোনো প্রতিবেদন হবে না। তিনি বলেন, আরে এটা কী করে সম্ভব যে ৫৭ জনের পরিচয় পাওয়া যাবে না। এটা কি সম্ভব? এটাই কি মস্ত বড় অপরাধ নয় মালিককে শাস্তির দেওয়ার জন্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি জিএসপি বন্ধ করে তবে কার দায়ে এটা হবে? তিনি বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ১৮ বছর বয়সে ভোটাধিকার দেওয়া হয়, আর বিজিএমইএ বলছে ২২-২৩ বছরের মানুষকে ইউনিয়ন করতে দেওয়া যায় না।
এর আগে আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পোশাক কারখানাতে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রম সংঘ করার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ওয়েলফেয়ার কমিটি করে তাঁরা এগোচ্ছেন। এখনো সময় হয়নি শ্রম সংঘ করার সুযোগ দেওয়ার। ২২-২৩ বছর বয়সীরা এই কারখানাগুলোতে কাজ করে উল্লেখ করে তিনি শ্রম সংঘের বিরোধিতা করেন। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পোশাকের বাজারে যে বড় ধরনের আঘাত আসার আশঙ্কা আছে সে বিষয়ে তিনি সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। বলেন, পরস্পরকে দোষারোপ করে লাভ নেই।
আনোয়ার উল আলম চৌধুরীর এই বক্তব্যের পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হক স্পষ্টভাষায় জানতে চান ইউনিয়ন দিতে চান কি না। জবাবে আনোয়ার উল আলম বলেন, এখনো সময় হয়নি। এ সময় শ্রমিকনেতারা একযোগে কথা বলে ওঠেন। এ পর্যায়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সবাইকে এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা করার জন্য ব্যবস্থা করা হবে বলে শান্ত করেন।
বিজিএমইএর বর্তমান সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজকে একটা জাতীয় সংকটের মধ্যে পড়েছে এই শিল্প। সবাইকে একত্রে আসতে হবে। দায় আমাদের নিতে হবে। ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ ভাবলে চলবে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হামিদা হোসেন বলেন, এটা কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। বিজিএমইএকে তাদের সদস্যপদ শ্রমিকের কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত করে শক্তভাবে দেখতে হবে।
সেন্ট্রাল উইমেন ইউনিভার্সিটির সোশিওলজি ও জেন্ডার স্টাডিজের অধ্যাপক এবং নারীনেত্রী মালেকা বেগম, সিপিবির উপদেষ্টা শহীদুল্লাহ চৌধুরী, নিজেরা করির খুশী কবীর প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।
এ ছাড়া শ্রমিকনেতা মন্টু ঘোষ, ফিরোজা বেগম, বাবুল আক্তার, নাজমা আক্তার, জেড এম কামরুল আনাম, লিমা ফেরদৌস, সিরাজুল ইসলাম রনি, কামরান রহমানসহ আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিকনেতা সংলাপে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডে মালিককে দায়ী করে তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। একই সঙ্গে পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রম সংঘ করার অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন।
পাঠকের মন্তব্য
সাইনইন
মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন








SHAMSUL HUDA
২০১৩.০১.২৭ ১৯:০১মালিককে এখনো সরকার গ্রেপ্তার করেনি কোন যাদুর বলে ? ভুায়া মামলায় ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছয় মাস ধরে জেলে আর জামাই বাবু তাজরীন মালিক মহা আননদে ঘুরে বেড়াছছেন ?