উৎসব

আমাদের নাট্যান্দোলন ও আরণ্যক

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান | তারিখ: ২৭-০১-২০১৩

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

আমরা মঞ্চকে স্কুল বানাইনি। মঞ্চ আদর্শ বা মতবাদ প্রচারের বিদ্যালয় নয়। ধর্মকথা শেখানোর জন্য গির্জা নয়। জিহাদ শেখানোর জন্য মেহরাব নয়। তবে মঞ্চ-মেহরাব থেকে আদর্শ, মতবাদ, ন্যায়নীতির কথা আবার মানুষ শুনতেও চায়। মঞ্চে লোকে হাসতে আসে, না নাট্যচর্চার সমালোচনার জন্য হাজির হয়, না হালফ্যাশনের হুজুগের বশবর্তী হয়ে কৌতূহল মেটাতে আসে, তা বলা মুশকিল।
যারা নাট্যকার বা নাট্যের সমঝদার, তারা নাটকের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে নানা কথা বলে। শুধু এই দিনে নয়, আদিকাল থেকে। অনেকে বলেন, নাটকের একটা সামাজিক কর্ম বা কর্তব্য রয়েছে। সমাজকল্যাণে নিবেদিত নাট্যকার মনে করেন, তাঁর কাজ অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগানো, দুর্গতি-হতাশার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় সাহস জোগানো, প্রতিরোধক্ষমতা জাগানো, উদ্বুদ্ধ করার জন্য মস্তকোপরি হস্ত উত্তোলন করে আত্মসমর্পণ না করে সেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শক্তি অর্জন করে প্রতিরোধ করার জন্য। একদিক থেকে আমরা সবাই নাট্যকর্মী। নাগরিক হয়ে আমরা সমাজে বাস করব না, এ তো হয় না। নাটক লেখা ও মঞ্চস্থ করার পেছনে একটা সমাজচেতনা থাকতেই পারে।
ড্রুরি লেন থিয়েটারের উদ্বোধনে স্যামুয়েল জনসন বলেন, ‘মঞ্চ জনসাধারণের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। নাটকের বিধান নাটকের পৃষ্ঠপোষকেরা নির্ধারণ করেন। কারণ, আমরা যাঁরা আনন্দদানের জন্য বাঁচি, তাঁদের আনন্দ দিতে হবে বাঁচার জন্য।’ এই আনন্দদানের কাজে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে এক সফল অভিনয়।
আমাদের সমাজ ও জীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে। নাটক সেসব প্রশ্ন নিয়ে যোঝাযুঝি করতে পারে, ধাঁধা থাকলে প্রহেলিকা সৃষ্টি করে রহস্যমোচনও করতে পারে। অনেক সময় অনেক প্রশ্ন অনুত্তর থেকে যেতে পারে। জীবনে লা-জবাব হওয়ার জন্য হয়তো একটা অবকাশ বা প্রস্তুতি থাকতে পারে। ওয়েটিং ফর গডো-তে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। উত্তর দেওয়ার সামান্য চেষ্টা করে দর্শকের জন্য সামান্য পথপ্রদর্শন করে নানা প্রশ্ন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আরণ্যক মনে করে একজন নাট্যকর্মী, তিনি নাট্যকার, অভিনেতা, কুশলী কিংবা নেপথ্যকর্মী যা-ই হোন না কেন, তাঁকে সমাজের কোনো না কোনো স্তরে বাস করতে হয়। সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো শিল্পকর্মীর অবস্থান শুধু অসম্ভব নয়, অকল্পনীয়ও বটে। সে কারণেই আজ আমরা লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত করে তুলতে চাই—শিল্প বেনিয়ারা নিপাত যাক—জনগণ ফিরে পাক তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর আরণ্যকের উদেযাগী ব্যক্তিরা ভাবলেন, তাঁরা কী করবেন? তাঁরা নিজেরাই উত্তর দিলেন, ‘কী করব মানে? অবশ্যই আমরা নাটক করব। সৃজনশীল কিছু একটা করার ইচ্ছায় আমরা সবাই তখন টগবগ করে ফুটেছি।’ ১৯৭২ সালেই মঞ্চে এল পশ্চিমের সিঁড়ি।
১৯৭৭ সালে মঞ্চে এল গন্ধর্বনগরী। দলের কর্মকাণ্ড শুরু হলো নতুন করে। গন্ধর্বনগরী এক অলীক নগরী, যে ধসে গেছে এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে। সেখানে শুধু বেঁচে আছে এক সুবিধাভোগী মানুষ। গন্ধর্বনগরীর পরপরই মঞ্চে এল ওরা কদম আলী। আরণ্যকের এক প্রবলতর উত্থান শুধু দলে নয়, দলের বাইরে দেশের সর্বত্র। মঞ্চে এল ওরা কদম আলী, ওরা আছে বলেই ও ইবলিশ। এই নাট্যত্রয়ীর ভেতর দিয়ে রূপ লাভ করল আরণ্যকের একটি সুনির্দিষ্ট রাজনীতিসচেতন ধারা।
মুক্ত নাটক বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় একটি নতুন ধারা সংযোজন। আরণ্যক নাট্যদলের প্রচেষ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গঠিত হলো অনেকগুলো মুক্ত নাটক দল। ঠিক একই সময়ে ১৯৮১ সালে মঞ্চে এল ইবলিশ সুস্পষ্ট রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে—নাটক শুধু বিনোদন নয়, শ্রেণীসংগ্রামের সুতীক্ষ হাতিয়ার। ১ মে বাংলা একাডেমীর বটমূলে মঞ্চস্থ হলো মহান মে দিবস উপলক্ষে নাটক—মে দিবস। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় যুক্ত হলো একটি ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য নির্মাণের একক স্থপতি আরণ্যক নাট্যদল। তারপর থেকে আজ অবধি প্রতিবছর মে দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাটক মঞ্চায়ন নিয়মিত ঘটনা; এ অনুষ্ঠান শুধু আরণ্যক নাট্যদলের। সমকালীন রাজনীতির পথে তৃতীয় বিশ্বের গিনিপিগসদৃশ জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার সংগ্রাম মূর্ত হয়ে উঠল গিনিপিগ নাটকে। অববাহিকা হলো সমকালীন সুখ-দুঃখের চালচিত্র। নানকার পালা নানকার কৃষক বিদ্রোহের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মুক্তনাটককে আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ১৯৮৬ সালে গঠিত হলো সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সহযোগী জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মুক্তনাটক দল। মুক্তনাটক দল আজ আলাদা সত্তা হলেও আরণ্যকের সঙ্গে তার রয়ে গেছে নিবিড় মেলবন্ধন।
মে দিবসের পথ ধরে এসেছে ক্ষুদিরামের দেশে, সিংহাসনের দুঃখ, ফেরারী নিশান, শেকল, কদম আলীর মে দিবস, নীলা, মৃগনাভি, আদার, ঘুমের মানুষ। এসবই রচিত হয়েছে সমকালীন রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে ব্যক্ত করে। সমতট পরবর্তী প্রযোজনা শেকসিপয়ারের কোরিওলেনাস।
বিভিন্ন সময়ে আরণ্যকের সদস্যরা ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, জাপান প্রভৃতি দেশে প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশের। আমাদের নাটককে পরিচিত করেছেন। ওরা কদম আলী জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়ে মঞ্চস্থ হয়েছে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগে-বিপর্যয়ে আমরা এগিয়ে গেছি সাধারণ মানুষের পাশে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি দুর্যোগে আমরা আমাদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। আমরা স্বৈরশাসনের আমলে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুনতে, অভিনয় দেখতে ভালোবাসতাম। আমি চট্টগ্রামে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বিটার নারী পাচারবিরোধী মীনকন্যার নাট্যাভিনয় দেখে মুগ্ধ হই। আমরা নিত্যকার জীবনে এমন অনেক দুর্দশা-দুর্গতি মুখ বুজে সহ্য করি, যার বিরুদ্ধে নাট্যকলার মাধ্যমে একটা স্থায়ী প্রতিরোধী অবস্থার সূচনা হতে পারে।
১৯৭১ সালে পোস্টার, এবারের সংগ্রাম ও স্বাধীনতাসংগ্রাম ঢাকা ও চট্টগ্রামে মঞ্চস্থ করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিন-তিনটি নাট্যগোষ্ঠী—থিয়েটার, আরণ্যক ও নাট্যচক্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম নাটক-পত্রিকা থিয়েটার প্রকাশিত হয়। বছর খানেক পরে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের বাকি ইতিহাস মঞ্চস্থ হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটকের নাম: সৈয়দ শামসুল হকের নুরলদীনের সারা জীবন, আবদুল্লাহ আল-মামুনের এখনও কৃতদাস, মামুনুর রশীদের ওরা কদম আলী, সেলিম আল দীনের কেরামত মঙ্গল, মমতাজউদ্দীন আহমদের রাজা অনুস্বরের পালা।
বাংলাদেশের নাটকের প্রথম পত্রিকা থিয়েটার প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের নভেম্বরে। ১৯৭২ সালে ঢাকা টেলিভিশন, ঢাকা বেতার ও চট্টগ্রাম বেতার থেকে বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। ১৯৭৭ সালে নাগরিক সৎ মানুষের খোঁজের রজতজয়ন্তী অভিনয় করে। দল হিসেবে নাগরিক প্রথম শততম অভিনয় সম্পন্ন করে। সেই বছরেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী প্রথম নাট্যোৎসবের আয়োজন করে।
১৯৮২ সালে দেশ ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরের বছর আইটিআইয়ের বিশ্ব-কংগ্রেসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি যোগদান করে। সেই বছরে এক নাট্যদল, থিয়েটার-এর ৫০০তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
নাট্যমঞ্চে আমরা পাশ্চাত্যমুখিতার বিরুদ্ধে সমলোচনা শুনেছি। আমাদের নাট্যজগতের গৌরব সেলিম আল দীন প্রসেনিয়াম-এর বিপরীতে বাংলা নাটকের কাব্য-উপন্যাস-নৃত্য-সংগীতের দ্বৈতাদ্বৈত্য রূপকে প্রতিফলিত করতে এক বড় যজ্ঞের সূত্রপাত করেন। আমি একে পাশ্চাত্যবিমুখিতা না বলে অন্তর্মুখিতা বলতে চাইব। আত্ম-আবিষ্কারে তার প্রয়োজন একান্ত করে অনুভব করা ও চর্চা করা উচিত। অবশ্য আমাদের মন যে এখন বিশ্ববিহারে আকৃষ্ট, সে ব্যাপারটাও অস্বীকার করা চলবে না। অতীতের ওপর দাগা বুলিয়ে চলতে গেলে তা কখনোই বড় পাথেয় হতে পারে না। আনন্দদায়ক তো নয়ই।
আমাদের দেশের নাট্য-আন্দোলন সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গৌরবের কথা। আজ থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখার একটা সদিচ্ছা সর্বত্র লক্ষ করা যায়। উন্নত দেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উভয় ক্ষেত্রে ভর্তুকিসহ নানাভাবে সাহায্যের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।


সাইনইন

মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন 

 
আপনার মতামত দিন