কিবরিয়া হত্যা

বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে!

শাহ্ মোহাম্মদ ইমাম মেহদী | তারিখ: ২৭-০১-২০১৩

  • ৫ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
শাহ এ এম এস কিবরিয়া

শাহ এ এম এস কিবরিয়া

২৭ জানুয়ারি। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। যখন তাঁর কথা স্মরণ করি, মনকে সান্ত্বনা দিতে পারি না। তাঁর মতো একজন মহৎ প্রাণ মানুষকে কেন গ্রেনেড মেরে হত্যা করা হলো? আমরা শোকে ব্যথিত ও বিহ্বল হই। বারবার প্রশ্ন করি, কেন নরঘাতকেরা তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল, কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের?
আট বছরেও হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত হলো না!
সাগর-রুনি হত্যা বা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা ঘটে রাতের অন্ধকারে। কিন্তু কিবরিয়াকে হত্যা করা হয় দিনের বেলায়ই। সেদিন সমাবেশে উপস্থিত গ্রামবাসী এই হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে। খুব কাছ থেকে খুনিরা গ্রেনেড ছুড়ে পালিয়েছে। কোনো না কোনো মানুষ তাদের পালাতে দেখেছেন। আমরা মনে করি, বৈদ্যেরবাজারের কাছাকাছি কয়েকটি গ্রামের লোকদের জিজ্ঞাসা করলেও প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
অপরাধী যত বুদ্ধিমান ও ভয়ংকর হোক না কেন, কিছু আলামত রেখে যায়। ঘাতকদের পেছনে যারা ছিল, তারাও সমভাবে দোষী। সরকারের দায়িত্ব হলো, তাদের খুঁজে বের করা। তাদের ধরতে পারলে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন রাষ্ট্রের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব। যেদিন কিবরিয়া গ্রেনেডে আক্রান্ত হলেন, সেদিন তাঁকে বাঁচানোর জন্য সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে কোনো হেলিকপ্টার পাওয়া গেল না। হবিগঞ্জ জেলার ডিসিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকেরা উদাসীনতা দেখালেন। কিন্তু বর্তমান সরকার ঘাতকদের খুঁজে বের করতে পারছে না কেন? ঘটনাস্থলে কিবরিয়ার ভাতিজা শাহ মনজুর গ্রেনেডের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন চাচাকে বাঁচাতে। কিন্তু তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কিবরিয়ার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে চার বছর আগে। মানুষ ভেবেছিল, তারা কিবরিয়া হত্যার বিচার করবে। কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর পরম শত্রুও বলতে পারবে না, তাঁর সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল। বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও স্বীকার করেছিলেন, কিবরিয়া সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় দিকটি খুবই ভালো বুঝতেন এবং প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতেন।
একবার ব্যক্তিগত আলোচনায় কিবরিয়া ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘আমরা যাঁরা সমাজে ওপরে আছি। গাড়ি-বাড়ি, শান-শওকতের যতই আড়াই-বড়াই করি না কেন, দেশের ভুখানাঙ্গা মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না এবং এখানে কোনো বেইমানি বরদাশত করা চলবে না।’
আমি দীর্ঘদিন লন্ডনে আছি। এখানে অনেক বিদেশির সঙ্গে কথা হয়। বাংলাদেশ নিয়ে কথা উঠলে তাঁরা কিবরিয়ার অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করেন, বাংলাদেশ তো এক মহা সম্ভাবনার দেশ। প্রশ্ন করেন, তোমাদের দেশে এত রাজনৈতিক অস্থিরতা—হরতাল, হামলা-মামলা, ভাঙচুর, খুনখারাবি কেন?
মনে পড়ে, ২০০৪ সালের নভেম্বর মাস। কিবরিয়া ভাই লন্ডনে এলেন। পরিবারের সবাইকে ডাকলেন। তখন সারা দেশে মুফতি হান্নান-বাংলা ভাইয়ের দৌরাত্ম্য চলছে। দেশের ৬৪টি জেলায় একসঙ্গে বোমাবাজি হয়েছে, এমনকি ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে হত্যা করার জন্য বোমা হামলা হয়েছিল। ভাগ্য ভালো, তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। কিবরিয়া বলেছিলেন, যে সরকার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। এখন দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা আছে, সে প্রশ্নও উঠতে পারে।
হত্যা জঘন্য অপরাধ। এর বিচার করা সরকারের কর্তব্য। কে কী বলেছে, তা বিবেচ্য বিষয় নয়। তাদের দায়িত্ব মামলার তদন্ত শেষ করে বিচার-প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান এই হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই মুফতি হান্নানের পেছনে কারা ছিল, সেটি বের করা কি সরকারের দায়িত্ব নয়? মূল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারলে কিবরিয়া হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত হবে না।
কিবরিয়া আমাদের বলতেন, একটি আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে চাই চেষ্টা, সাধনা এবং সংগ্রামী চেতনা। তিনি নিজের জীবনেও সেটি করে দেখিয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবনে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। চাকরি জীবনে ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। রাজনীতিতে এসে কিংবা অর্থমন্ত্রী হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বলতেন, রাজনীতি এমন নয় যে, নদীতে ভাসমান পাল ছেড়ে দিলাম আর ভাসতে ভাসতে যে পেয়ে গেল, সে-ই হয়ে যাবে আসল মাঝি। তা হয় না। আদর্শকে মনের গভীরে শক্তভাবে গেঁথে নিতে হয় এবং সব বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।
কিবরিয়ার পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে বলছি। আমরা গত আট বছরে কিবরিয়া হত্যার বিচার পাইনি। বিচারের দাবিতে তাঁর বিধবা পত্নী আসমা কিবরিয়া, তাঁর স্বজনেরা মানববন্ধন করেছেন। রাস্তায় আন্দোলন করেছেন। কিন্তু এখনো বিচার পাননি। আসমা কিবরিয়া একজন কিডনির রোগী, প্রতি সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিস করাতে হয় তাঁকে। তার পরও তিনি এই আশা নিয়ে বেঁচে আছেন যে, তাঁর স্বামীর হত্যার বিচার হবে, খুনিরা শাস্তি পাবে।
আমিও ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সরকারের কাছে বিচার চেয়ে চিঠি লিখেছি এবং দরখাস্ত করেছি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। বলতে চেষ্টা করেছি যে বৈদ্যেরবাজারে কিবরিয়ার যে সভা ছিল, সেখানে মাত্র ছোট ছোট কয়েকটি গ্রামের কয়েক শ লোক জমায়েত হয়েছিল। সেখান থেকে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করা মোটেই কঠিন কাজ নয়। সরকার আন্তরিক হলে কিবরিয়ার খুনিদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া সম্ভব।
শাহ্ মোহাম্মদ ইমাম মেহদী: লন্ডনপ্রবাসী আইনজীবী, শাহ এ এম এস কিবরিয়ার চাচাতো ভাই।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।


সাইনইন

মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন 

 

Biplob Roy Genis

Biplob Roy Genis

২০১৩.০১.২৭ ০৭:২৮
কিবরিয়া সাহেব হয়তো মন্ত্রী হয়েও সংশ্লিষ্ট নেতা-নেত্রীর মন রক্ষা করতে পারেন নি। তিনি চেয়েছিলেন দেশ ও দেশবাসীর মন রক্ষা করতে। তাই, তার মতো একজন মানুষ হত্যার বিচার এ সরকারের সময়েও হলো না। এটা জাতি হিসেবে লজ্জার। জানি, এই ক্ষমতাসীনরা এসব প্রশ্নের জবাবে অকাট্য জবাব তৈরি করে রেখেছন। তাদের মুখটাই তো অকাট্য। তাদের কাছে বিচার দাবি করে কি লাভ !!

Salekin

Salekin

২০১৩.০১.২৭ ০৮:৩৬
কিবরিয়া হত্যার বিচার খুবই জরুরী । সেই সাথে আরো একটা বিষয় জানা দরকার - কেনো কেউ কিবরিয়াকে একটা স্যালাইন দিলো না - একজনের দেহ থেকে সমানে রক্ত ঝরছে আর কেউ তাকে স্যালাইন দিল না ! শুধু মাতর স্যালাইন দিলেই হয়ত কিবরিয়াকে বাচানো যেত ।

২০১৩.০১.২৭ ১১:৪৮
কিবরিয়া হত্যার বিচার কখনোই হবে না। কারন যে চলে গেছে তারচেয়ে বেচে থাকগুলোকেই(যারা কিবরিয়াকে মেরছে ) শেখ হাসিনার বেশি দরকার!

শাহাবুদ্দিন শুভ

শাহাবুদ্দিন শুভ

২০১৩.০১.২৭ ১৭:৪৩
দুঃসহ যন্ত্রনা ও বেদনা বুকে নিয়ে স্বামী শাহ এএসএম কিবরিয়র মৃত্যুর দু’বছর পার করেছি আমি। তাকে ছাড়া এই দু’বছর কী করে বেঁচে আছি ভাবতে পারি না। কষ্ট বোঝানোর মত ভাষা আমার জানা নেই। আমার মতো এ ভাবে কাউকে যেন বৈধব্য বরণ করতে না হয়। কারো স্বামী যেন এভাবে মৃত্যু বরণ করতে না হয়, এই আমার প্রার্থনা। আমার স্বামীকে যেভাবে গ্রেনেড হামলা করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোন সভ্য দেশে সম্ভব কিন না ভাববার বিষয়। যে গ্রেনেড যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় , এই দেশে গ্রেনেড রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য এখন নিক্ষেপ করা হচ্ছে নিরপরাধ মানুষের উপর। দশ ট্রাক ভর্তি গ্রেনেড আনা হয়েছিল চট্রগ্রাম বন্দরে। ফলাও করে এগুলো দেখানো হয়েছি টেলিভিশন গুলোতে। কিন্তু কে বা কারা এগুলো এনেছিল তার কোন তদন্ত ঠিকমত হয়নি। সেই গ্রেনেড গুলো কোথায় রাখা হয়েছে। সেগুলো দিয়ে কি করা হয়েছে তার জনগণকে জানাতে পারল না। ভাবতে অবাক লাগে একজন শান্তি প্রিয়, অমায়িক ,পরহিতৈষী, সুযোগ্য দেশ প্রেমিককে হত্যা করতে কারো হাত কাপলো না। কিবরিয়ার হত্যার পর জীবন সঙ্গীকে হারিয়ে আক্ষেপের সুরে আসমা কিবরিয়া সাপ্তাহিক ‘মৃধুভাষ’নে এই কথা গুলো লিখে ছিলেন তার লেখা বেদনায় নীল হয়ে আছি শিরোনামে ২০০৭।
আসমা কিবরিয়ার এই লেখার মাধ্যমে সহজেই বুঝা যায় কিবরিয়ারকে কতটা ভালবাসতেন এবং এখন বাসেন। তিন তিনটি সরকার গত হতে যাচেছ কিন্তু আজ কিবরিয়া হত্যার কোন বিচার হচ্ছে না। হচ্ছে হবে করে আর কত বছর অতিবাহিত হবে। তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে।

Mohammed Rezaul Karim

Mohammed Rezaul Karim

২০১৩.০১.২৭ ২৩:২৯
সরকারের দরকার হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কারন তারাই একমাত্র পথের কাটা। কিবরিয়া সােহব তো আর এই দুনিয়ায় নেই। তাই বিচার করার বিষয়টা..........