টাকা দেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
সমীক্ষা ছাড়াই রামনাবাদে সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে
কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা ছাড়াই পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রামনাবাদে সমুদ্রবন্দরের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। শুরুতে ছোট আকারের (লাইটার) জাহাজের পণ্য খালাসের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এই বন্দরের সব ব্যয় বহন করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নিয়মানুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের টাকা বাইরের কোনো প্রকল্পে ব্যয় করার সুযোগ নেই। তাই এই প্রকল্পে বন্দরের টাকা ব্যবহার করতে একে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘সম্প্রসারিত বন্দর’ হিসেবে ঘোষণার জন্য সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও চালানো হচ্ছে।
জানতে চাইলে বন্দর চেয়ারম্যান ও রামনাবাদ বন্দর প্রকল্পের সমন্বয়ক রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যে পণ্য খালাসের কার্যক্রম চালু করা যায়, এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজে হাত দেওয়া হয়েছে।
তবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এ ধরনের একটি বন্দর করার উদ্যোগ নেওয়ায় বিশ্লেষকেরা একে একটি ‘রাজনৈতিক বন্দর’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামনাবাদে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সম্প্রতি নৌপরিবহনমন্ত্রীও কলাপাড়ায় এক সভায় বলেছেন, সরকার এখানে একটি বন্দর করতে চায়। তবে এতে বেশ সময় লাগবে। এ কাজ এগিয়ে নিতে তিনি আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড সদস্য (পরিকল্পনা) হাদী হোসেন মনে করেন, সমুদ্রবন্দর নির্মাণ অনেক ব্যয়বহুল। বরং প্রথম দিকে পোতাশ্রয় করে এবং আলাদা একটি সংস্থা গঠন করে তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের সমীক্ষাসহ প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করা উচিত।
সমুদ্রবন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি তদারকি সেল গঠন করা হয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি বন্দরের বিশেষ বোর্ড সভায় হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের প্রধান লে. কমান্ডার হাবিব-উল-আলমকে প্রধান করে সাত সদস্যের সেল গঠন করা হয়। এই সেল বন্দর স্থাপন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত প্রতিবেদন দেবে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটিও কাজ করছে।
তদারকি সেলের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজে আসা খোলা পণ্য লাইটার জাহাজে বোঝাই করে রামনাবাদ চ্যানেলে প্রস্তাবিত বন্দরে নিয়ে খালাস হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে হাতিয়ার দক্ষিণ অংশ হয়ে সাগরপথে ৩২০ কিলোমিটার দূরে প্রস্তাবিত বন্দরে পণ্য পরিবহন করা হবে। সাগর উত্তাল হলে সন্দ্বীপ চ্যানেল হয়ে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে পণ্য পরিবহনের বিকল্প চিন্তাও আছে। একইভাবে মংলা বন্দর থেকে লাইটার জাহাজে করে ১২০ কিলোমিটার দূরে এ প্রস্তাবিত বন্দরে পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা আছে।
রামনাবাদ চ্যানেলে সমুদ্রবন্দর হলে এই দুই বন্দর থেকে কী পরিমাণ পণ্য সেখানে পরিবহন হবে, পণ্য পরিবহনের ব্যয় সাশ্রয়ী কি না, এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমীক্ষা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বড় আকারের সমীক্ষা করে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য আনা-নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
বন্দর না থাকায় এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বেসরকারি ঘাটগুলোতে লাইটার জাহাজে পণ্য ওঠানামা করা হয়। লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের হিসাবে, এখন চট্টগ্রাম থেকে লাইটার জাহাজে দক্ষিণাঞ্চলে সামান্য পরিমাণ পণ্য পরিবহন হচ্ছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে সোয়া কোটি টন পণ্য দেশের নানা প্রান্তে পরিবহন হয়। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে বছরে যায় পাঁচ লাখ টন। পটুয়াখালী ও আশপাশের এলাকায় ২০-২৫ হাজার টন পণ্য যায়। এর বাইরে মংলা বন্দর থেকেও দক্ষিণাঞ্চলে পণ্য কিছু পরিবহন হয়।
জানা গেছে, কলাপাড়ায় প্রাথমিকভাবে দুটি পন্টুন, একটি প্রশাসনিক ভবন এবং একটি গুদাম নির্মাণ করে এই বন্দরের কার্যক্রম শুরু করা হবে। এর জন্য পাঁচ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং করা হবে। কলাপাড়ার লালিয়া ইউনিয়নে ১০০ একর জমি অধিগ্রহণেরও প্রস্তুতি চলছে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০-৩৫ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে।
ইতোমধ্যে বন্দরের প্রস্তাবিত সংশোধিত বাজেটে এই খাতে প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পণ্য খালাসের মাশুল থেকে এই টাকা তুলে নেওয়ার চিন্তা আছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।
তদারকি সেল সূত্রে জানা গেছে, রামনাবাদ চ্যানেলের প্রবেশমুখে পানির গভীরতা কম, প্রায় তিন মিটার। চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব জাহাজ ভেড়ে, সেগুলো রামনাবাদ চ্যানেলে ভেড়াতে হলে সমুদ্র থেকে চ্যানেল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকা নদী খনন করে গভীরতা বাড়াতে হবে। এ কাজ ব্যয়বহুল।
বিষয়টি মানেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানও। তিনি বলেন, পরিপূর্ণ বন্দর করতে হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য
সাইনইন
মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন







মাহতাব হোসেন # বাউফল # পটুয়াখালী #
২০১৩.০১.২৭ ০৭:১৭আমি নদী বিশেষজ্ঞ নই, তবে বাস্তব অবস্থায় এ নদী বা চ্যানেলটার বিষয়ে আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে। আগুনমুখা, বুড়াগৌরাঙ্গ (তেতুলিয়া), ডিগ্রী ও গলাচিপা নদীর স্রোত একত্রিত হয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে এবং চ্যানেলটা খুবই প্রমত্তা, তাই এটার ভাটিতে তথা প্রবেশমুখে মাত্র তিন মিটার পানি থাকার কথা নয়। প্রস্তাবিত বন্দরের সাথে যোগাযোগের সড়ক পথটায় অবস্থিত স্বপ্নের পদ্মাসেতুসহ আরও দু'টো সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন, আর সেই সাথে প্রয়োজন সড়কের প্রয়োজনীয় প্রশস্তকরণ ও বাক সোজাকরণ ; তাহ'লেই চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের চেয়েও এটার উপযোগিতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশী বলে অবশ্যই প্রতিপন্ন হবে। আর সেই সাথে সাথে মংলা বন্দর বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য যে স্থায়ী হুমকি হয়ে আছে, তা দিনে দিনে কমিয়ে আনাও সম্ভব হবে।
ABDUL MAJID QUAZI
২০১৩.০১.২৭ ০৮:৩৮