কর্মসংস্থান
চাকরি খুঁজো না, চাকরি দাও
মালয়েশিয়ায় পামবাগানে শ্রমিক যেতে পারবেন বাংলাদেশ থেকে। প্রতি মাসে বেতন বাংলাদেশি টাকায় ২৫ হাজার। ৩০ হাজার কর্মীর জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ১৫ লাখ কর্মপ্রত্যাশী। এর আগে গত বছরে চার হাজার ৬০০ সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষার আবেদন করেছেন মাত্র এক লাখ ৯১ হাজার চাকরিপ্রত্যাশী। উভয় ক্ষেত্রে সাফল্যের দেখা পাবেন খুবই কমসংখ্যক প্রাথী। অবশিষ্ট প্রার্থীদের হয় পরের বারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, নতুবা বেকারত্বের ঘানি টেনে নিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশে এখন বেকার বা ছদ্মবেকারের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এর চেয়ে জরুরি হলো, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ কর্মপ্রত্যাশী কর্মবাজারে আসেন। আমরা শুনেছি, সরকারি আর আধা সরকারি মিলে আমাদের মোট চাকরির সংখ্যাই নাকি ১৫ লাখ! ইচ্ছা করলেই সরকার এই পদের সংখ্যা কয়েক শ গুণ বাড়াতে পারবে না। তাহলে ২০-২১ সালে আমরা যে পরিবারপ্রতি কমপক্ষে একজনের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছি, সেটি কীভাবে পূরণ হবে? নাকি এটি সোনার হরিণই থেকে যাবে?
আমাদের দেশে আমরা কি বড় আকারের শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারব দ্রুত গতিতে, কাঙ্ক্ষিত গতিতে; বলা মুশকিল। তবে, বড় আকারের বেসরকারি সংস্থাও কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের কর্মসংস্থানের চূড়ান্ত সমাধান নয়। যেমন: আজ প্রায় ৬০ বছর ধরে ওষুধ, আবাস ও হাসপাতালশিল্পে কাজ করছে, এমন একটি শিল্প-পরিবার এ পর্যন্ত ৪৫ হাজার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল কোম্পানিতে কর্মীর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি নয়। সাধারণভাবে বলা যায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে আমাদের কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান নেই।
অন্যদিকে, কয়েক বছর ধরে আমরা একটি বিশেষ ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি ইন্টারনেটের বদৌলতে। একটি কম্পিউটার আর একটি ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই এখন একজন শিক্ষিত ব্যক্তি নিজেই স্বতন্ত্র উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা একটু তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা তো অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারেন। বাংলাদেশের লাখ খানেক তরুণ-তরুণী এখন ইন্টারনেটে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করছেন। বছর চারেক আগে, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক থেকে আমরা যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে এই পেশার পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করি, তখন হাতেগোনা কয়েকজন তরুণ এই ডলার-রাজ্যের খোঁজ রাখতেন। এখন জানলাম, এই মুহূর্তে ইন্টারনেটের জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস এডেস্ক ডট কমে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশের কর্মী রেজিস্ট্রেশন করেছেন; যদিও সবাই এখনো সেভাবে কাজ পাচ্ছেন না। তবে, একটি খুবই রক্ষণশীল হিসাব। ২০১২ সালেই আমাদের এই তরুণ কর্মী বাহিনী প্রতিদিন এক কোটি ডলার আয় করেছেন! ইন্টারনেট যে কেবল স্বতন্ত্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে তা নয়, এটি প্রায় সবার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
কাজে কেবল স্বতন্ত্র ও মুক্ত উদ্যোক্তা নয়, সুযোগ এসেছে দেশে উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোক্তাবান্ধব একটি পরিবেশ সৃষ্টি করার। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এভাবে যাঁরা নিজেদের বৈশ্বিক গ্রামের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলবেন, তাঁরা কখনোই ‘চাকরি জাতীয়করণের জন্য পুলিশের সঙ্গে লাঠালাঠি করতে যাবেন না’।
তবে, যেভাবেই আমরা বলি না কেন, আমাদের সমাজ এখনো উদ্যোক্তাদের ভালো চোখে দেখে না। অনেকেই মনে করেন, মুনাফা খারাপ। ব্যবসায়ী মাত্রই অসৎ এবং অবৈধভাবে টাকা আয় করেন। আমরা বিল গেটস বা ওয়ারেন বাফেটের গল্প করতে ভালোবাসি, কিন্তু ব্যবসায়ী উদ্যোক্তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় ইতস্তত করি। বিয়ের বাজারে উদ্যোক্তার নিজের চেয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দর ভালো।
আমাদের দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার সংস্কৃতি যে গড়ে ওঠেনি, তার একটা কারণ হলো ঔপনিবেশিক শিক্ষা। এই শিক্ষা আমাদের কেরানি বানাতে চেয়েছে এবং সফল হয়েছে। ফলে আমাদের সবার ধ্যানজ্ঞান থাকে চাকরি নামের সোনার হরিণ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস তৈরির সময়ও চাকরির ব্যাপারটি মাথায় রাখা হয়।
আবার উদ্যোক্তাদের মধ্যে সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে দারুণভাবে। আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠানের তীর্থ সিলিকন ভ্যালির সাধারণ প্রতীতি হলো, একটি গুগল পাওয়ার জন্য কমপক্ষে আড়াই হাজার চেষ্টা করতে হয়। আমেরিকার প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ নিয়ে কোর্স করানো হয় এবং সেখানকার পড়াশোনাও বেশ ব্যতিক্রমী। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করার পর সবাই নিজে একটা কিছু করার চেষ্টা করেন। কয়েকবার ফেল করার পর তাঁরা চাকরি করতে যান। এসব কারণে সেই দেশে উদ্যোক্তাবান্ধব একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ইসরায়েলেও একই রকম ব্যাপার। ইসরায়েলকে তো বলা হয় স্টার্টআপ নেশন!
আমাদের এখন দরকার দেশে আত্মকর্মসংস্থানের একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কাজটা সহজ হবে না, তবে সেটি মোটেই অসম্ভব নয়।
আমরা যদি আমাদের তরুণদের সুযোগ করে দিতে পারি, তাহলে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারব। তাঁদের ব্যবসা শেখার সুযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পরিচর্যাকেন্দ্র গড়ে তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য নানা আয়োজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে; সেই সঙ্গে দরকার তাঁদের অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়া।
আমরা নানা খাতে প্রতিবছরই হাজার কোটি টাকা নষ্ট আর অপচয় করি। আগামী অর্থবছরে, অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব মাত্র ১০ কোটি টাকা এ খাতে দেওয়ার জন্য। এই ১০ কোটি টাকা দেওয়া হবে এক হাজার দলকে, যার প্রতিটিতে তিনজন করে সদস্য থাকবেন। তাঁরা তাঁদের আইডিয়া বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন। সরকার ইচ্ছে করলে তদারকির ব্যবস্থা করবে; না করলেও চলবে।
এই দলগুলোর কোনোটি আইটি প্রতিষ্ঠান করবে, কেউ কেউ কাজ করবে কৃষি-বাণিজ্য নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলার জন্য নতুন কিছু বের করার চেষ্টা করবেন অনেকে সদস্য। আবার অনেকে মুক্ত পেশাজীবী হবেন। মাত্র ১০ মাসেই এই তিন হাজার উদ্যোক্তা সারা দেশের তরুণদের জন্য অনেক অনুকরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করবেন। তাঁদের দেখানো পথে যাঁরা হাঁটবেন, তাঁদের জন্য সরকারকে তখন কিছুই করতে হবে না।
এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, আমাদের যে ৩৩ লাখ লোক এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ আমাদের স্বপ্নবাজ তরুণদের পাশে দাঁড়াবেন, এনজেল ইনভেস্টর হবেন এবং তাঁদের কাঁধে হাত দিয়ে বলবেন, ‘চাকরি খুঁজো না, চাকরি দাও।’
মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।
পাঠকের মন্তব্য
সাইনইন
মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন







Sanowr Hussain
২০১৩.০১.৩১ ০৭:৩২fuad
২০১৩.০১.৩১ ০৭:৫৩SANJOY SARKAR
২০১৩.০১.৩১ ০৮:১০Amity.duVietnam
২০১৩.০১.৩১ ০৮:২৬arifur
২০১৩.০১.৩১ ০৮:৩০polash saha
২০১৩.০১.৩১ ০৯:১৯Jonathon
২০১৩.০১.৩১ ০৯:২২S.M. Alimuzzaman
২০১৩.০১.৩১ ১০:১৭Mohammed Arifur Rahman Chowdhury
২০১৩.০১.৩১ ১০:১৯কর্মক্ষেত্র তয়রি করতে আপনি আর্থিক (ব্যাঙ্ক ঋণ), সামাজিক (গ্রহণযোগ্যতা), প্রশাসনিক (নিরাপত্তা) সাহায্য পাবেন না, তো আপনি কর্মক্ষেত্র তয়রি করবেন কি করে?
তারপরও অনেকেই করে যাচ্ছেন তাদের সাধুবাদ জানাই।
Saifur Rahman
২০১৩.০১.৩১ ১০:২৬Bashir Uzzaman
২০১৩.০১.৩১ ১০:২৬Hasan Mahmud
২০১৩.০১.৩১ ১০:৪৯Mehir Kumar Mondal
২০১৩.০১.৩১ ১১:৪৩ABDUL MAJID QUAZI
২০১৩.০১.৩১ ১২:১৩Tonmoy Rahman
২০১৩.০১.৩১ ১২:২১nirmal
২০১৩.০১.৩১ ১২:৩৫Md. Asadur Rahman, Chittagong
২০১৩.০১.৩১ ১৩:০১Md.Abdul Hye
২০১৩.০১.৩১ ১৩:০৭Ahsan
২০১৩.০১.৩১ ১৩:২২Shibly Amin
২০১৩.০১.৩১ ১৩:২৩আমাদের সবার নিজ নিজ উদ্দোগেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সামর্থ্যবানদের। আর তাহলেই একটু একটু করে চেন্জ আসবে।
Shibly Amin
২০১৩.০১.৩১ ১৩:২৫হলে আর মন্তব্য করে লাভ কি?
আর কতদিন এমন চলবে?
Aminul Ahesan
২০১৩.০১.৩১ ১৫:৪৬Ataur rahman
২০১৩.০১.৩১ ১৫:৪৮Faruk Alam
২০১৩.০১.৩১ ২০:০৬rubel
২০১৩.০১.৩১ ২৩:৩১