দশ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলা
এক বছরে দুই জবানবন্দি, নতুন তথ্য ‘হাওয়া ভবন’
চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় এক বছরের মধ্যে আদালতে দুই দফা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি হাফিজুর রহমান। উভয় জবানবন্দিতে ঘটনা সম্পর্কে তিনি প্রায় একই রকম বিবরণ দিয়েছেন। তবে দ্বিতীয় দফায় জবানবন্দিতে তিনি একটি নতুন তথ্য দিয়েছেন। সেটা হচ্ছে, এই বিশাল অস্ত্র চালান এ দেশে আনার আগে উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়া ঢাকায় ‘হাওয়া ভবনে’ গিয়েছিলেন। হাফিজ বলেন, তাঁকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে পরেশ বড়ুয়া জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তত্কালীন পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা বলে হাওয়া ভবনের ভেতরে যান এবং দুই ঘণ্টা পর বেরিয়ে এসে জানান, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
হাফিজ চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে গত বছরের ২ মার্চ প্রথম এবং গত শনিবার দ্বিতীয় দফায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দুটি মামলায় (অস্ত্র ও চোরাচালান) দুই দফা জবানবন্দি নেন আদালত।
প্রথম আলোর হাতে আসা উভয় জবানবন্দি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দ্বিতীয় জবানবন্দিতে হাওয়া ভবনের কথা ছাড়াও আরও কিছু নতুন তথ্য রয়েছে। তিনি বলেছেন, ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করার পর তাঁকে ঢাকার মিরপুরের দুটি মামলায় জড়িয়ে রিমান্ডে নিয়ে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন র্যাব কর্মকর্তারা। টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) কেন্দ্রে (র্যাবের সদর দপ্তরে) এ জিজ্ঞাসাবাদের সময় হাফিজ ১০ ট্রাক অস্ত্র আনার ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছেন। তখন তাঁকে র্যাবের তত্কালীন একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হুমকি দেন। হাফিজ বলেন, ‘...হুমকি দেয় যে আপনি এ কথাগুলো কোথাও প্রকাশ করলে আপনাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে অথবা এইডসের জীবাণু ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হবে। ওই সময় মেজর আতিকও উপস্থিত ছিলেন। ওই ভয়ে আমি এসব ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করিনি।’
দ্বিতীয় দফা জবানবন্দিতে হাফিজ আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হলে ২০০৮ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তখন তিনি তত্কালীন তদন্ত কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেনের কাছেও সব ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চান। কিন্তু তখন জবানবন্দি নথিভুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এরপর নতুন কর্মকর্তা তদন্তভার গ্রহণের পর তিনি গত বছর আদালতে জবানবন্দি দেন। তবে তখনো তাঁর মনে ভয় ও আতঙ্ক ছিল।
দ্বিতীয় দফা জবানবন্দি দেওয়ার আগে হাফিজকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে হাফিজকে জেরা করা হলেও কোনো ভয়ভীতি প্রদর্শন বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। ওই কর্মকর্তার দাবি, হাফিজ হাওয়া ভবন সম্পর্কে রিমান্ডেও একই রকম কথা বলেছেন।
সিআইডির সূত্রটি আরও জানায়, এবারের জবানবন্দিতে যে নতুন তথ্য এসেছে, রিমান্ডেও এসব কথা বলেছিলেন। আগের জবানবন্দিতে এসব কথা কেন বলা হয়নি, সে সম্পর্কে হাফিজ সিআইডিকে বলেছেন, টিএফআই সেলে তাঁকে যে কর্মকর্তা ‘ক্রসফায়ার’ বা এইডস-জীবাণু দিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন, সে কর্মকর্তা এখন আর না থাকায় এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় তাঁর ভয় দূর হয়েছে।
গত শনিবার দেওয়া জবানবন্দিতে হাফিজ বলেছেন, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার মাসখানেক আগে তাঁকে আবার পরেশ বড়ুয়া ঢাকায় ডেকে পাঠান। তখন পরেশ বড়ুয়া তাঁকে নিয়ে কয়েকটি জায়গায় যান। হাফিজের ভাষায়, ‘পরদিন সকালে আমাকে আবার উইমপি রেস্টুরেন্টে যেতে বলে।... খাওয়া শেষে আমি তার লেক্সাস গাড়িতে উঠি। গাড়িতে উঠে তিনি (পরেশ) জানান, তাঁকে বনানী যেতে হবে। গাড়িতে বসে তিনি আমাকে জানান, মালগুলো (অস্ত্র) আটক না হয়ে যাতে নির্বিঘ্নে আসতে পারে, সে জন্য যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে দেখা করব। তিনি হাওয়া ভবনের খুব কাছের লোক। তিনি বর্তমানে এনএসআইর পরিচালক (নিরাপত্তা) হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীরও নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। তিনি আরও বলেন, লোকটি এখন হাওয়া ভবনে অবস্থান করছেন। ওনার বাড়ি চাঁদপুর। উনি খুব ভালো লোক। উনি সব ব্যবস্থা করবেন। কথা বলতে বলতে আমরা এক সময় হাওয়া ভবনের সামনে পৌঁছে যাই। তিনি নেমে হাওয়া ভবনে ঢুকে পড়েন। আমি তাঁর গাড়িতে বসে থাকি। ঘণ্টা দুয়েক পর তিনি ওখান থেকে বের হয়ে আসেন। এসে আমাকে জানান, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনি এখন চট্টগ্রাম চলে যান। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি মালগুলো কী? তিনি আমাকে বলেন, ‘ওখানে আমাদের অনেক ফ্যাক্টরি আছে, সেগুলোর জন্য বিভিন্ন মেশিনারি পার্টস। আপনার ওগুলো নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আপনি টাকা পেলেই তো হলো। সরকারি জেটিতে মাল নামবে নির্বিঘ্নে।’
হাওয়া ভবনের আগের দিনের ভ্রমণ সম্পর্কে হাফিজ বলেন, ‘তিনি (পরেশ) আমাকে বলেন, চলেন ঘুরে আসি। আমি জিজ্ঞেস করি কোথায়? তিনি বলেন, দুটো জায়গায় যাব। প্রথমে তিনি আমাকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের কাছে সিএসডি স্টোরের সামনে যান। এরপর তিনি নেমে যান। যাওয়ার আগে আমাকে বলেন, ওখানে ডিজিএফআই ও এনএসআইএর কিছু বড় কর্মকর্তা আছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আসি। আমি ত্ার লেক্সাস গাড়িতে বসে ছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর তিনি ফিরে আসেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসার পথে আমাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে হোটেল রেড স্টারে নামিয়ে দেন।’
গত শনিবার হাফিজের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০২ সালেও উলফা অস্ত্রের চালান আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে হাফিজের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা ধার নেন পরেশ বড়ুয়া। তখন পরেশ বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে তাঁদের কিছু যন্ত্রাংশ আসবে, তা হাফিজকে ছাড় করানোর ব্যবসা দেওয়া হবে। হাফিজ বলেন, ওই মালমাল আর আসেনি। পরেশ বড়ুয়া পরে ধারের ৫০ লাখ টাকা ভেঙে ভেঙে পরিশোধ করেন এবং আরও ১৯ লাখ টাকা বেশি দেন।
এ কথা গত বছরের মার্চে দেওয়া জবানবন্দিতে হাফিজ বলেননি। বরং ওই জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর তাঁকে পরেশ বড়ুয়া বিভিন্ন সময়ে খরচের জন্য টাকা দিয়েছেন।
সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি হাফিজকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে সিআইডি আদালতকে বলেছিলেন, ‘১০ ট্রাক অস্ত্রবাহী জাহাজের নাম বের করতে তাঁকে আবার রিমান্ডে নেওয়া জরুরি। কিন্তু রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বা আদালতে জবানবন্দিতে হাফিজের কাছ থেকে এ ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আদালতে বলেছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরে যে জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করে ট্রলারে উঠানো হয়, সে জাহাজে কোনো পতাকা ছিল না। জাহাজের ক্যাপ্টেন ও কর্মীদের চেহারা ছিল মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের। জাহাজের নাম কালো কাপড় ও কালো টেপ দিয়ে ঢাকা ছিল।
দুই দফা জবানবন্দিতেই হাফিজ ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) জন্য আনা এই বিশাল অস্ত্র চালানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। তাঁর দাবি, অস্ত্রের চালান খালাসের আগ পর্যন্ত তিনি জানতেন যে যন্ত্রপাতি (মেশিনারিজ পার্টস) আনা হবে।
হাফিজ বলেন, তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। সে সুবাদে ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন চিত্রপরিচালকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। কিছুদিন পর ওই চিত্রপরিচালকের ঢাকার বনানীর বাসায় জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম ফারুক অভির মাধ্যমে হাফিজের সঙ্গে উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়ার সম্পর্ক হয়। তখন পরেশ বড়ুয়া নিজেকে জামান নামে পরিচয় দেন। জবানবন্দিতে হাফিজ দাবি করেন, ২০০৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি পরেশ বড়ুয়ার প্রকৃত পরিচয় জানতেন না। ওই বছরের জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে তাঁকে ঢাকায় ডেকে পাঠায় পরেশ বড়ুয়া। তখন ধানমন্ডির এক রেস্তোরাঁয় পরেশ বড়ুয়ার নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন।
হাফিজ বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করি পুলিশ আপনাদের ধরে না? আপনারা তো বেআইনিভাবে আছেন। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা আছে এনএসআই ও ডিজিএফআই? আমি বলি জানি। পরেশ বড়ুয়া আমাকে বলেন, আমরা এখানে তাদের তত্ত্বাবধানে আছি, তারা আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে। আর সরকারি শেল্টারে আমরা থাকি। বাংলাদেশে আমাদের অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। আপনার টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা হবে না। আপনাকে ব্যবসা দেব। তাঁর কথা শুনে আমি ভয় পাচ্ছিলাম। তিনি আরও বলেন, আপনি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেন। আপনার কোনো সমস্যা হবে না।
হাফিজ জানান, সমুদ্রে জাহাজ থেকে দুটি ট্রলারে মাল খালাসের সময় অদূরে নৌবাহিনীর একটি টহল জাহাজ দেখতে পান। প্রায় ১৪ ঘণ্টা ধরে মাল খালাস হয়। এরপর নৌবাহিনীর জাহাজটিও সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
শুধু তাই নয়, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার জেটিতে অন্ধকারের কারণে ট্রলার ভেড়ানো যাচ্ছিল না। তখন কোস্টগার্ডের জাহাজ থেকে সার্চলাইট মেরে ট্রলার জেটিতে ভেড়াতে সহায়তা করে।
হাফিজ গত বছর প্রথম জবানবন্দিতেই এ অস্ত্র চালান আনার সঙ্গে তত্কালীন কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা প্রকাশ করেন। এরপর সিআইডির তদন্তে আরও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় অস্ত্র চালান ধরা পড়ার সময় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তত্কালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তত্কালীন পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও এনএসআইয়ের তখনকার পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবউদ্দিন ও একই সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা আকবর হোসেন খানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সাহাবউদ্দিন গত বছরের মে মাসে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সাহাবউদ্দিন জবানবন্দিতে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও হাওয়া ভবনে পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে বৈঠক বা এ ঘটনায় হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কিছু বলেননি।
হাফিজ চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে গত বছরের ২ মার্চ প্রথম এবং গত শনিবার দ্বিতীয় দফায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দুটি মামলায় (অস্ত্র ও চোরাচালান) দুই দফা জবানবন্দি নেন আদালত।
প্রথম আলোর হাতে আসা উভয় জবানবন্দি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দ্বিতীয় জবানবন্দিতে হাওয়া ভবনের কথা ছাড়াও আরও কিছু নতুন তথ্য রয়েছে। তিনি বলেছেন, ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করার পর তাঁকে ঢাকার মিরপুরের দুটি মামলায় জড়িয়ে রিমান্ডে নিয়ে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন র্যাব কর্মকর্তারা। টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) কেন্দ্রে (র্যাবের সদর দপ্তরে) এ জিজ্ঞাসাবাদের সময় হাফিজ ১০ ট্রাক অস্ত্র আনার ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছেন। তখন তাঁকে র্যাবের তত্কালীন একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হুমকি দেন। হাফিজ বলেন, ‘...হুমকি দেয় যে আপনি এ কথাগুলো কোথাও প্রকাশ করলে আপনাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে অথবা এইডসের জীবাণু ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হবে। ওই সময় মেজর আতিকও উপস্থিত ছিলেন। ওই ভয়ে আমি এসব ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করিনি।’
দ্বিতীয় দফা জবানবন্দিতে হাফিজ আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হলে ২০০৮ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তখন তিনি তত্কালীন তদন্ত কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেনের কাছেও সব ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চান। কিন্তু তখন জবানবন্দি নথিভুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এরপর নতুন কর্মকর্তা তদন্তভার গ্রহণের পর তিনি গত বছর আদালতে জবানবন্দি দেন। তবে তখনো তাঁর মনে ভয় ও আতঙ্ক ছিল।
দ্বিতীয় দফা জবানবন্দি দেওয়ার আগে হাফিজকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে হাফিজকে জেরা করা হলেও কোনো ভয়ভীতি প্রদর্শন বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। ওই কর্মকর্তার দাবি, হাফিজ হাওয়া ভবন সম্পর্কে রিমান্ডেও একই রকম কথা বলেছেন।
সিআইডির সূত্রটি আরও জানায়, এবারের জবানবন্দিতে যে নতুন তথ্য এসেছে, রিমান্ডেও এসব কথা বলেছিলেন। আগের জবানবন্দিতে এসব কথা কেন বলা হয়নি, সে সম্পর্কে হাফিজ সিআইডিকে বলেছেন, টিএফআই সেলে তাঁকে যে কর্মকর্তা ‘ক্রসফায়ার’ বা এইডস-জীবাণু দিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন, সে কর্মকর্তা এখন আর না থাকায় এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় তাঁর ভয় দূর হয়েছে।
গত শনিবার দেওয়া জবানবন্দিতে হাফিজ বলেছেন, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার মাসখানেক আগে তাঁকে আবার পরেশ বড়ুয়া ঢাকায় ডেকে পাঠান। তখন পরেশ বড়ুয়া তাঁকে নিয়ে কয়েকটি জায়গায় যান। হাফিজের ভাষায়, ‘পরদিন সকালে আমাকে আবার উইমপি রেস্টুরেন্টে যেতে বলে।... খাওয়া শেষে আমি তার লেক্সাস গাড়িতে উঠি। গাড়িতে উঠে তিনি (পরেশ) জানান, তাঁকে বনানী যেতে হবে। গাড়িতে বসে তিনি আমাকে জানান, মালগুলো (অস্ত্র) আটক না হয়ে যাতে নির্বিঘ্নে আসতে পারে, সে জন্য যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে দেখা করব। তিনি হাওয়া ভবনের খুব কাছের লোক। তিনি বর্তমানে এনএসআইর পরিচালক (নিরাপত্তা) হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীরও নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। তিনি আরও বলেন, লোকটি এখন হাওয়া ভবনে অবস্থান করছেন। ওনার বাড়ি চাঁদপুর। উনি খুব ভালো লোক। উনি সব ব্যবস্থা করবেন। কথা বলতে বলতে আমরা এক সময় হাওয়া ভবনের সামনে পৌঁছে যাই। তিনি নেমে হাওয়া ভবনে ঢুকে পড়েন। আমি তাঁর গাড়িতে বসে থাকি। ঘণ্টা দুয়েক পর তিনি ওখান থেকে বের হয়ে আসেন। এসে আমাকে জানান, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনি এখন চট্টগ্রাম চলে যান। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি মালগুলো কী? তিনি আমাকে বলেন, ‘ওখানে আমাদের অনেক ফ্যাক্টরি আছে, সেগুলোর জন্য বিভিন্ন মেশিনারি পার্টস। আপনার ওগুলো নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আপনি টাকা পেলেই তো হলো। সরকারি জেটিতে মাল নামবে নির্বিঘ্নে।’
হাওয়া ভবনের আগের দিনের ভ্রমণ সম্পর্কে হাফিজ বলেন, ‘তিনি (পরেশ) আমাকে বলেন, চলেন ঘুরে আসি। আমি জিজ্ঞেস করি কোথায়? তিনি বলেন, দুটো জায়গায় যাব। প্রথমে তিনি আমাকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের কাছে সিএসডি স্টোরের সামনে যান। এরপর তিনি নেমে যান। যাওয়ার আগে আমাকে বলেন, ওখানে ডিজিএফআই ও এনএসআইএর কিছু বড় কর্মকর্তা আছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আসি। আমি ত্ার লেক্সাস গাড়িতে বসে ছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর তিনি ফিরে আসেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসার পথে আমাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে হোটেল রেড স্টারে নামিয়ে দেন।’
গত শনিবার হাফিজের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০২ সালেও উলফা অস্ত্রের চালান আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে হাফিজের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা ধার নেন পরেশ বড়ুয়া। তখন পরেশ বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে তাঁদের কিছু যন্ত্রাংশ আসবে, তা হাফিজকে ছাড় করানোর ব্যবসা দেওয়া হবে। হাফিজ বলেন, ওই মালমাল আর আসেনি। পরেশ বড়ুয়া পরে ধারের ৫০ লাখ টাকা ভেঙে ভেঙে পরিশোধ করেন এবং আরও ১৯ লাখ টাকা বেশি দেন।
এ কথা গত বছরের মার্চে দেওয়া জবানবন্দিতে হাফিজ বলেননি। বরং ওই জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর তাঁকে পরেশ বড়ুয়া বিভিন্ন সময়ে খরচের জন্য টাকা দিয়েছেন।
সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি হাফিজকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে সিআইডি আদালতকে বলেছিলেন, ‘১০ ট্রাক অস্ত্রবাহী জাহাজের নাম বের করতে তাঁকে আবার রিমান্ডে নেওয়া জরুরি। কিন্তু রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বা আদালতে জবানবন্দিতে হাফিজের কাছ থেকে এ ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আদালতে বলেছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরে যে জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করে ট্রলারে উঠানো হয়, সে জাহাজে কোনো পতাকা ছিল না। জাহাজের ক্যাপ্টেন ও কর্মীদের চেহারা ছিল মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের। জাহাজের নাম কালো কাপড় ও কালো টেপ দিয়ে ঢাকা ছিল।
দুই দফা জবানবন্দিতেই হাফিজ ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) জন্য আনা এই বিশাল অস্ত্র চালানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। তাঁর দাবি, অস্ত্রের চালান খালাসের আগ পর্যন্ত তিনি জানতেন যে যন্ত্রপাতি (মেশিনারিজ পার্টস) আনা হবে।
হাফিজ বলেন, তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। সে সুবাদে ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন চিত্রপরিচালকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। কিছুদিন পর ওই চিত্রপরিচালকের ঢাকার বনানীর বাসায় জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম ফারুক অভির মাধ্যমে হাফিজের সঙ্গে উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়ার সম্পর্ক হয়। তখন পরেশ বড়ুয়া নিজেকে জামান নামে পরিচয় দেন। জবানবন্দিতে হাফিজ দাবি করেন, ২০০৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি পরেশ বড়ুয়ার প্রকৃত পরিচয় জানতেন না। ওই বছরের জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে তাঁকে ঢাকায় ডেকে পাঠায় পরেশ বড়ুয়া। তখন ধানমন্ডির এক রেস্তোরাঁয় পরেশ বড়ুয়ার নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন।
হাফিজ বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করি পুলিশ আপনাদের ধরে না? আপনারা তো বেআইনিভাবে আছেন। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা আছে এনএসআই ও ডিজিএফআই? আমি বলি জানি। পরেশ বড়ুয়া আমাকে বলেন, আমরা এখানে তাদের তত্ত্বাবধানে আছি, তারা আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে। আর সরকারি শেল্টারে আমরা থাকি। বাংলাদেশে আমাদের অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। আপনার টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা হবে না। আপনাকে ব্যবসা দেব। তাঁর কথা শুনে আমি ভয় পাচ্ছিলাম। তিনি আরও বলেন, আপনি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেন। আপনার কোনো সমস্যা হবে না।
হাফিজ জানান, সমুদ্রে জাহাজ থেকে দুটি ট্রলারে মাল খালাসের সময় অদূরে নৌবাহিনীর একটি টহল জাহাজ দেখতে পান। প্রায় ১৪ ঘণ্টা ধরে মাল খালাস হয়। এরপর নৌবাহিনীর জাহাজটিও সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
শুধু তাই নয়, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার জেটিতে অন্ধকারের কারণে ট্রলার ভেড়ানো যাচ্ছিল না। তখন কোস্টগার্ডের জাহাজ থেকে সার্চলাইট মেরে ট্রলার জেটিতে ভেড়াতে সহায়তা করে।
হাফিজ গত বছর প্রথম জবানবন্দিতেই এ অস্ত্র চালান আনার সঙ্গে তত্কালীন কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা প্রকাশ করেন। এরপর সিআইডির তদন্তে আরও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় অস্ত্র চালান ধরা পড়ার সময় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তত্কালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তত্কালীন পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও এনএসআইয়ের তখনকার পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবউদ্দিন ও একই সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা আকবর হোসেন খানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সাহাবউদ্দিন গত বছরের মে মাসে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সাহাবউদ্দিন জবানবন্দিতে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও হাওয়া ভবনে পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে বৈঠক বা এ ঘটনায় হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কিছু বলেননি।
পাঠকের মন্তব্য
সাইনইন
মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন




friendly reminder
২০১০.০২.০৯ ০৩:০৬Rajib Ahmed
২০১০.০২.০৯ ০৩:৩৮We are just digging our own lovely graves.
Ashraf Pervez
২০১০.০২.০৯ ০৬:১৯I am not getting the objective of AL from this. If anyway BNP or Jamat is involved in this we want exemplary punishment without damaging the image of the whole nation. But looks like AL is trying to get something by playing with this.
Don’t play with such an issue- then people may ask how BCL are some time getting this kind of weapons? We are now watching this in the news papers everyday.
Vindeshi
২০১০.০২.০৯ ০৬:৪৪mehedi hashan
২০১০.০২.০৯ ০৯:১৯So now the govt is out to implicate Hawa Bhaban. Why?
প্রথম আলো কি হাওয়া ভবনের সাফাই গাওয়ার প্রচারে নেমেছে? প্রথম আলো-র আওয়ামী বিরোধিতা গ্রহনযোগ্য, কিন্তু যেখানে দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত সেখানে হাওয়া ভবনের পক্ষে সুক্ষ সাফাই শোভা পায় ?
Musa Sarkar
২০১০.০২.০৯ ১২:০৮iftakharul alam
২০১০.০২.১০ ০১:২৪