প্রিয় পাঠক
ছদ্মনাম বা সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে লেখা কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা হবে না। আপনার প্রোফাইল আপডেট করুন।
অনুরোধক্রমে
প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ
আপনি যদি প্রথম আলোর তালিকাভুক্ত ব্যবহারকারী হন তাহলে সাইন ইন করুন| তালিকাভুক্ত না হলে
রেজিস্ট্রেশন করুন|
পাসওয়ার্ড ভুলে গিয়ে থাকলে পুনরায় নির্ধারন করুন |
X বন্ধ করুন
-
তাসলিমা
পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দুই কাঠা জমিই কাল হয়েছিল নাচোলের দরবেশপুর গ্রামের তাহের মণ্ডলের মেয়ে তাসলিমার। রিকশা-ভ্যানচালক স্বামী ভোলাহাট উপজেলার লালাপুর গ্রামের জাহেদ জমি বিক্রি করে তাঁকে টাকা দিতে বলেন। কিন্তু তাসলিমা এতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নির্যাতন।
তাসলিমা কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘স্বামীর কথামতো যৌতুকের টাকা দিতে না পেরে একমাত্র মেয়ে আয়শাকে নিয়ে পালিয়ে চলে আসি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর শহরের বেলেপুকুরে চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে। সে জায়গারও খোঁজ পেয়ে যায় আমার স্বামী। ২০০২ সালের ৭ মে গভীর রাতে বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাত্ করে গায়ের ওপর এসিড ঢেলে দেয়। এতে আমরা (মা-মেয়ে) প্রাণে বেঁচে গেলেও মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয় চিরস্থায়ী ক্ষতের।’ ব্র্যাক ও এসিড সারভাইভরস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
তাসলিমার স্বামী ভোলাহাট উপজেলার লালাপুর গ্রামের জাহেদ এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
এ অবস্থায় প্রথম আলো সহায়ক তহবিল তাসলিমার পাশে এসে দাঁড়ায়। ২৮ জুলাই ২০০৫ তাসলিমার হাতে তুলে দেওয়া হয় বাছুরসহ একটি দুধেল গাভী ও চার হাজার টাকা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজানুর রহমান এগুলো হস্তান্তর করেন। এ ছাড়া তাসলিমার বাড়িতে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে একটি গোয়ালঘর। তাসলিমা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘কোনো নারীর যেন আমার মতো অবস্থা না হয়। প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য আমার খুবই ভালো লাগছে। গরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চালাব, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাব।’
-
মিনা বেগম
‘২০০৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাবু মোল্লার ধানের চাতালে কাজ করার সময় মিন্টু ঘটক আমার গায়ে এসিড মারে। এর আগে মিন্টু আমাকে কুপ্রস্তাব দেয়, আমি তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এসিড দিয়ে আমার বুক, পিঠ ঝলসে দেয়। শুধু আমারে এসিড মাইরেই ক্ষান্ত হয় নাই। আমার সহজ-সরল স্বামী ও শাশুড়িকে দিয়ে আমাকে লিখিতভাবে তালাক দিতে বাধ্য করায়। এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে চিরদিনের মতো বাবার বাড়ি চলে আসি।’
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে একটি বাছুরসহ গাভী ও গোয়ালঘর পেয়ে গোপালগঞ্জের এসিডদগ্ধ মিনা বেগম আরও বললেন, ‘যারা আমারে গরু ও ঘর দিল, আল্লাহ তাগোরে ভালো করুক। আমি এই গরুর আয় দিয়ে পোলা-মাইয়াগো মানুষ কইরে আমার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে চাই।’
৩১ জুলাই ২০০৫ কাশিয়ানী উপজেলার কুমারিয়া বাজারে সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলার পুলিশ সুপার কাজী মো. ফজলুল করিম।
-
আমার পাশে প্রথম আলো
‘যৌতুকের দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আমার স্বামী আমার মুখ এসিডে ঝলসে দেয়। আমার বাবা-মা থেকেও নেই। বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় তারা দুজনই আলাদা বিয়ে করে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকে। আমি আমার ভাইয়ের সংসারে বোঝা হয়ে ছিলাম। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার মতো অসহায় আর কেউ নেই।’ সেই হনুফা বেগম ১ আগস্ট ২০০৫ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘আমি এখন অসহায় নই। আমার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রথম আলো। তাদের দেখাদেখি এলাকার ছোট-বড় সবাই আমার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগাচ্ছে। আমি এখন নিজেকে স্বাবলম্বী ভাবতে শুরু করেছি।’
প্রথম আলোর এসিডদগ্ধ সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া গাভী, বাছুর ও গোয়ালঘর পেয়ে হনুফা এ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। এসিডদগ্ধ হওয়ার পর নানাভাবে হনুফাকে সহায়তাকারী মারুফ হোসেন বলেন, ‘হনুফাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলাম। এখন চিন্তা দূর হয়েছে।’
-
সাতক্ষীরার সুফিয়া
সুফিয়া বলেন, ‘জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন ২০০২ সালের ১৪ অক্টোবর রাতে আমাকে এসিড ছুড়ে মারে। এতে আমার মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে যায়। এসিডদগ্ধ হওয়ার পর প্রথম আলো সহায়ক তহবিল আজ বাছুরসহ গাভী দিয়ে আমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগালো। এখন থেকে আমাকে আর কারও ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে না। প্রথম আলোর দেওয়া এ গাভীর দুধ বেচেই আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব।’
প্রথম আলো এসিডদগ্ধ সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া বাছুরসহ গাভী পেয়ে এভাবেই তাঁর অভিব্যক্তি জানান সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বদ্দীপুর গ্রামের রফিকুলের স্ত্রী এসিডদগ্ধ সুফিয়া বেগম। গাভী ও বাছুর হস্তান্তর উপলক্ষে ৪ আগস্ট ২০০৫ বদ্দীপুরের এবতেদায়ি মাদ্রাসা মাঠে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
-
আমি এখন আর অসহায় নই
‘আমি এখন আর অসহায় নই। আমার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রথম আলো। আট হাজার টাকা পাওয়ায় বইপত্রসহ শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারব। বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও এত দিন অর্থাভাবে প্রাইভেট পড়তে পারিনি। সামনেই এইচএসসি পরীক্ষা, প্রতিমাসে এক হাজার টাকা পেলে প্রাইভেট পড়াটাও হবে।’ এসিডদগ্ধ মেধাবী ছাত্রী শামসুন্নাহার তাঁর অনুভূতির কথা তুলে ধরলেন এভাবে।
প্রথম আলো এসিডদগ্ধ সহায়ক তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মাহমুদাবাদ এলাকার মেধাবী কলেজছাত্রী শামসুন্নাহার ওরফে মুক্তা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। তহবিল থেকে ৩১ আগস্ট ২০০৫ আগস্ট শামসুন্নাহারকে এককালীন আট হাজার টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁর পড়াশোনাকালীন প্রতিমাসে এক হাজার টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়।
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে শামসুন্নাহার বলেছিলেন, ‘গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাতে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলাম। রাত দেড়টার দিকে দুর্বৃত্তরা টিনের চালে ঢিল ছোড়ে। আমি বাড়ির ঘুমিয়ে থাকা লোকদের ডাকার চেষ্টা করি, কেউ ওঠে না। পরে পিচকারী দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে এসিড ছোড়ে। এতে মুখমণ্ডলসহ শরীরের বেশকিছু অংশ ঝলসে যায়। আমার চিত্কারে সবাই জেগে ওঠে। বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় জানতাম এসিড লাগলে পানি দিতে হয়, বাড়ির লোককে বলি প্রচুর পানি ঢালতে, তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হাসপাতালে। কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আমার বোনজামাই আবুল হোসেন এসিড ছোড়ে। এর আগেও এসিড নিক্ষেপের প্রাক্কালে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরই আমার বিজ্ঞান শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারিনি। এসিডে আক্রান্ত হওয়ার পর নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে হতে লাগল। ভেবেছিলাম, অভিশপ্ত জীবন কেবল শুরু হয়েছে।’
শামসুন্নাহারের বাবা গোলাপ মিয়া চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেন, আর কোনো মেয়ে যেন এভাবে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার না হয়।
শিক্ষাবৃত্তি প্রদান উপলক্ষে গত ৩১ আগস্ট ২০০৫ বুধবার সকালে নারায়ণপুর রাবেয়া মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেলাবোর ইউএনও দেলোয়ার হোসেন।
-
শেরপুরে এসিডদগ্ধকে বিয়ে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন
শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের আলিনাপাড়ার মৃত আবদুল কুদ্দসের মেয়ে রেণুমালা ওরফে রীনাকে ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর তাঁর আগের স্বামী আবলুস মিয়া এসিডে ঝলসে দেন।
এসিডদগ্ধ রেণুমালা বলেন, ‘যৌতুকের জন্য আবলুস (আগের স্বামী) আমার বাবাকে চাপ দেয়, টাকা না দিতে পারায় রাতে আমার গায়ে এসিড ছোড়ে। এতে আমার শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। বিকৃত হয় আমার মুখ। এসিড ছোড়ার চার বছর পর ২০০০ সালে গরিব টেম্পোচালকের (সাইফুল ইসলাম সংগ্রাম) সঙ্গে বিয়ে হয়। এ ঘরে দুটো ছেলেমেয়ে আছে। আমার স্বামীর রোজগার কম, তার সামান্য আয়ে আমাদের সংসার চলে না। তাই আমার বাবার বাড়িতে চলে আসি। আমার দুর্দশা সইতে না পেরে আমার বাবা মারা যান। এখন আমার কষ্টগুলো দূর হবে। দুটি গাভী পালন করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পারব। ছেলেমেয়ে দুজনকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে পারব। আমার ওপর এসিড নিক্ষেপের পর ভেবেছিলাম, মরে গেলেই বুঝি ভালো হতো। কিন্তু আজ বেঁচে থেকে দেখতে পাচ্ছি, প্রথম আলোসহ অনেকেই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে আমি ভীষণ খুশি। আমি এখন স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকতে পারব।’
দুটি গাভী ও গোয়ালঘর পেয়ে এভাবেই নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নের কথাগুলো বললেন, শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের আলিনাপাড়া গ্রামের এসিডদগ্ধ রেণুমালা।
পাশের গ্রামেরই এক তরুণ এসিডদগ্ধ রেণুমালাকে বিয়ে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রেণুমালার নতুন স্বামী সাইফুল ইসলাম ওরফে সংগ্রাম বললেন, ‘রেণুমালার অসহায়ত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য এসিডদগ্ধ রীনাকে বিয়ে করেছিলাম, কোনো রকম আর্থিক সহায়তার জন্য নয়। রীনার আগে বিয়ে হলেও রীনার সঙ্গেই আমার প্রথম বিয়ে হয়। বর্তমানে আমাদের দুটো ছেলেমেয়ে।’
২০ সেপ্টেম্বর ২০০৫ দুপুরে এসিডদগ্ধ নারীদের সাহায্যার্থে প্রথম আলো এসিডদগ্ধ সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া দুটি গাভী আনুষ্ঠানিকভাবে রেণুমালার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ উপলক্ষে তারাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মজিবর রহমান তালুকদার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরপুর সদর ইউএনও তাহমিদুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে শেরপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রেণুমালাকে এসিড নিক্ষেপের দায়ে তাঁর সাবেক স্বামী আবলুস ও তাঁর সহযোগী সবুর আলী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে শেরপুর জেলা কারাগারে।
-
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী গ্রামের এসিডদগ্ধ আঞ্জুয়ারা। ঘর ও গরু আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর উপলক্ষে ৮ নভেম্বর ২০০৫ আঞ্জুয়ারার বাড়ির উঠানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের পক্ষ থেকে হাতীবান্ধা ইউএনওর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চার বছরের জন্য আঞ্জুয়ারাকে আরএমপি প্রকল্পে চাকরিতে নিয়োগেরও ঘোষণা দেন তিনি।
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আঞ্জুয়ারা বলেন, ২০০২ সালের ২ জুলাই তাঁর প্রথম স্বামী আবেদ আলী আনুমানিক রাত দুইটার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় এসিড ছুড়ে তাঁকে মারেন। এতে তাঁর মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়।
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে ঘর ও গরু পেয়ে আনন্দে আঞ্জুয়ারা বললেন, ‘আগোত মাইনষের বাড়ির আনদোন ঘরোত আছনুং-এলা নিজের ঘরোত থাকিম। বিপদের দিনোত কায়ও আগে আইসে নাই। সবার আগোত প্যাথম আলো আছছে।’
সিঙ্গিমারী ইউপির চেয়ারম্যান এম জি মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন হাতীবান্ধার ইউএনও জয়ন্ত শিকদার।
-
এসিড-সন্ত্রাস যাঁদের জীবনের গতি বদলে দিয়েছে, এমন কয়েকজন এসিডদগ্ধ নারীর মধ্যে চারজন উদ্যোক্তা নূরুন্নাহার, লিজা, মুক্তি আর মুন্নী। যাঁদের বয়স ১৮-২৫ বছরের মধ্যে। প্রত্যেকেই পড়াশোনা জানেন। পাশাপাশি জানেন কিছু সেলাইকাজ। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের একটি কর্মসংস্থান দরকার। সোশ্যাল ইনিশিয়েটিভস লিমিটেড তাঁদের স্বাবলম্বী করার জন্য অফিসে কিছুটা জায়গা করে দেওয়াসহ অন্যান্য সহযোগিতা করেছে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল আর্থিক সহায়তা। এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা করছে প্রথম আলো সহায়ক তহবিল।
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ৪৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। প্রথম কিস্তি ২৫ হাজার টাকা গত বছর দেওয়া হয়েছিল।
দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় জসীম নামের একটি ছেলে নুরুন্নাহারকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। প্রেমে সাড়া না দেওয়ায় ১৯৯৫ সালের ৩০ জুলাই রাতে জসীম ১১ জনের একটি সন্ত্রাসী দলকে নিয়ে এসিড মেরে পালিয়ে যায়। পরে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ছয় মাস চিকিত্সাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরে যান নূরুন্নাহার।
এসিড-আক্রমণের পর তাঁর মা থানায় মামলা করেন। মামলার ফলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলে পটুয়াখালী কোর্টে বিচার হয়। বিচারের রায়ে দুজনের ফাঁসি, তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ছয়জনকে বেকসুর খালাশ দেওয়া হয়। পরে ঢাকার হাইকোর্টে আপিল করলে বাকি ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে তৈয়ব নামের এক ছেলে লিজাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। সে মাস্তান ধরনের ছেলে ছিল। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় লিজাকে এসিড মারে। তখন বাড়িতে কেউ ছিল না। লিজার চিত্কারে পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। চিত্কার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোবা হয়ে যায় লিজা। এভাবে ১৫ দিন কেটে যায়। পরে প্রায় আট মাস তাঁর চিকিত্সা হয় ঢাকার এক ক্লিনিকে।
ডান হাতে রগের অপারেশন হয়। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে গত ২৭ নভেম্বর লিজার অপারেশন করেন চিকিত্সক অরোরা। এর আগে আরও চারবার অপারেশন হয়। বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ। এ বিষয়ে মামলা করা হয়। আসামির ১৪ বছরের সাজা হয়। কিন্তু আসামি বিদেশে অবস্থান করছে।
মুক্তি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। হাজারীবাগ এলাকার মাস্তান ডানো তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মুক্তিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। একদিন ডানো তাঁকে অনেকগুলো বেলী ফুলের মালা পাঠায়, এতে মুক্তি খুব রেগে যান। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে ডানো ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এর মধ্যে ২৬ আগস্ট রাত আনুমানিক তিনটায় ঘুমন্ত অবস্থায় দরজা খুলে ডানো ও তার সঙ্গীরা মুক্তিকে এসিড নিক্ষেপ করে। এতে মুক্তি ও তাঁর খালাতো বোন গুরতরভাবে আক্রান্ত হন। এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁরা জেলে। মামলা চলছে।
তাহমিনার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। নোয়াখালী থেকে মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট প্রশিক্ষণ কোর্স শেষে সিলেটে চাকরি নেন তিনি। সেখানে নয় মাস চাকরি করার পর এই দুর্ঘটনা ঘটে। তাহমিনা যে হাসপাতালে কাজ করতেন, সেখানে কাজ করতেন একজন আয়া। তাঁর নাম ছিল পপি। পপি ছিল বিবাহিত। তাঁর আড়াই বছরের একটি মেয়ে ছিল। পপির বিয়ের আগে একটি ছেলে তাঁকে সবসময় উত্ত্যক্ত করতেন। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বিয়ের খরচ বাবদ তাঁদের কাছে ২০ হাজার টাকা যৌতুকও দাবি করেছিলেন। পপির মা এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না। মায়ের ভাষ্য ছিল, ‘যদি পছন্দ হয়, তবে যৌতুক ছাড়াই আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।’
পরে পপির মা অন্য এক ছেলের সঙ্গে পপিকে বিয়ে দেন। বিয়ের পর পপি তাঁর স্বামীকে নিয়ে সিলেট শহরে বসবাস করতেন। পপি আর তাহমিনা একসঙ্গেই যাওয়া-আসা করতেন। ২০০০ সালের ২৭ মার্চ রাতে পপির পূর্বপরিচিত সেই ছেলেটি পপিকে এসিড ছুড়ে মারেন। তাতে দুজনই দগ্ধ হন। প্রাথমিক চিকিত্সার পর ঢাকা মেডিকেলে চার মাস চিকিৎসা হয়। তারপর ইতালিতে চিকিত্সা হয় তাঁর।
এই প্রকল্প পাল্টে দিতে পারে চার নারীর জীবন
ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর সোশ্যাল ইনিশিয়েটিভস অফিসে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সেলাই প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় কিস্তি ২৩ হাজার টাকা প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন।
-
স্বামী ও দেবরের ষড়যন্ত্রে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষকের মেয়ে এসিডদগ্ধ শুক্লা রানি ঢালী এখনো সিঁথিতে সিঁদুর নেন। স্বামীকে ঘৃণা করেন, তবু ধর্মীয় বন্ধন থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেনি। বললেন, এ যেন জীবন্ত থেকেও মৃত্যুর যন্ত্রণা। শুক্লা প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া গরু ও বাছুর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে অর্থকষ্টের অথই জলে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। এ সহায়তা আমাকে ভেলায় চড়িয়েছে। এর মাধ্যমে কিনারা খুঁজে নিতে সচেষ্ট হব। নিশ্চয়ই স্বাবলম্বীর পরবর্তী গন্তব্য হাতের মুঠোয় ধরা দেবে...।’
দৌলতপুর কৃষি ডিপ্লোমা কলেজের ছাত্রী এসিডদগ্ধ শুক্লা রানী ঢালী বললেন, ‘ছাত্র অবস্থায় প্রেম করে নবেন্দু মল্লিককে বিয়ে করি। শ্বশুরবাড়ির কেউ আমাদের এ বিয়ে মেনে নেয়নি। অত্যাচার করত আমার ওপর। কষ্ট সহ্য করতাম। কারণ, হিন্দুরীতি মতে, একবারই বিয়ে হয়।’
একপর্যায়ে স্বামীর স্বীকৃতি আদায়ের জন্য খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা করি। আদালতে মামলার কারণে ২০০৫ সালের ২৫ অক্টোবর গল্লামারী ব্রিজের কাছে স্বামী-ভাশুরদের হাতে এসিডদগ্ধ হই। এতে আমার পুরো পিঠ ঝলসে যায়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার প্রধান আসামিরা এখনো পলাতক।
তাঁরা এখনো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন।
৬ সেপ্টেম্বর ২০০৫ বুধবার দুপুরে ডুমুরিয়া উপজেলার আলাইপুর গ্রামের শুক্লাদের বাড়ির কাছে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে একটি গাভি ও বাছুর তুলে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে সেখানে এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশ হয়। তাঁকে একটি গোয়ালঘরও করে দেওয়া হয়। এর জন্য ব্যয় হয় ৩৫ হাজার টাকা।
আলাইপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি চিত্তরঞ্জন মল্লিকের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জিললুর রহমান।
অনুষ্ঠানে এসিডদগ্ধ শুক্লা বলেন, ‘ভালোবেসে ঠাকুরকে সাক্ষী রেখে শাঁখা ও সিঁদুর পরে যাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম, কিন্তু স্বামীর পরিবার আমাদের ভালোবাসার বিয়ে মেনে নেয়নি। পরে স্বামীও বিগড়ে যায়। তখন স্বামীর স্বীকৃতি পেতে আদালতে মামলা করি। কিন্তু ভাবতেই পরিনি, তারা ক্ষিপ্ত হয়ে এমন অমানুষের মতো কাজ করবে।’
-
এখন সংসার চালাতে পারব
খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলার ঘোষরা গ্রামের কামাল মোড়লের বড় মেয়ে সেলিনা বেগমের বিয়ে হয় ১৯৯৫ সালে। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে।
কেঁদে কেঁদে সেলিনা বেগম বললেন, ‘শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যৌতুক না দেওয়ায় ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আমাকে এসিড নিক্ষেপ করে। এতে আমার মুখের ডানপাশ ও গলা ঝলসে যায়। এ ঘটনায় স্বামী, ভাশুর, দেবরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতের বিচারে তাঁর দেবর রেজাউলের ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হয়।
খুলনার ডুমুরিয়া ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৫ বৃহস্পতিবার পৃথক অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে এসিডদগ্ধ নারী সেলিনা বেগমকে বাছুরসহ গাভি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় নগদ অর্থ।
গাভি পেয়ে সেলিনা জানালেন, ‘গরুর দুধ বিক্রির টাকায় একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে পারব।’
ডুমুরিয়ার আঠারোমাইল বাজারে সেলিনার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে গাভি ও বাছুর তুলে দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উপদেষ্টা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের প্রধান সামন্তলাল সেন ও ঢাকার সানিডেল স্কুলের অধ্যক্ষ তাজিন আহম্মেদ।
অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উপদেষ্টা ও সানিডেলের অধ্যক্ষ তাজিন আহম্মেদ এসিডদগ্ধ সেলিনাকে স্কুলের পক্ষ থেকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা দেন। এ ছাড়া লালমনিরহাটের শৈলিকা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পোশাক দেওয়া হয়।
-
গরু পেয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী মনে হচ্ছে
পাবনার বেড়া উপজেলার নান্দিয়ারা গ্রামের এসিডদগ্ধ কামরুন নাহার ওরফে কাকলী বলেন, ‘২০০২ সালের ২৪ নভেম্বর আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়ে তাঁতশ্রমিক আনোয়ার হোসেন এসিড ছোড়ে। এতে আমার মুখ, গলা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। মামলায় গত বছর আসামি আনোয়ারকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু তাকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু আনোয়ার এবং তার লোকজন আমার পরিবারকে এখনো নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে।’
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া গোয়ালঘর, বাছুরসহ গাভী পেয়ে এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছিলাম, তখন প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার পর থেকে নিজেকে আর একা মনে হয়নি। গরু পেয়ে নিজেকে আজ স্বাবলম্বী মনে হচ্ছে।’
৮ আগস্ট ২০০৬ নান্দিয়ারা গ্রামের কামাল হোসেনের মেয়ে কামরুন নাহারদের বাড়িসংলগ্ন মাঠে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গোয়ালঘর-গাভি-বাছুর হস্তান্তর করা হয়। প্রবীণ সমাজসেবক শামছুুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেড়ার ইউএনও তরিকুল আলম।
কামরুন নাহারকে এসিড নিক্ষেপ মামলার আসামি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তারে জরুরি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে ইউএনও আশ্বাস দেন।
-
এহন দুই বেলা ভাত খাইতে পারমু
পাথরঘাটার হাতেমপুর গ্রামের আফজাল হোসেনের স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, ২০০১ সালের ১৩ জানুয়ারি রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। জমি নিয়ে বিরোধ ছিল ভাশুরের সঙ্গে। এর জের ধরে এসিডদগ্ধ হই। এতে তাঁর শরীর ও নিম্নাঙ্গ ঝলসে যায়। প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে বাছুরসহ দুটি গাভি ও গোয়ালঘর পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘যেদিন এসিডদগ্ধ অইছিলাম, হেইদিন মনে হইছিল, আমার কেউ নাই। ভাবছিলাম, আমার বুঝি সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে। এহন দেহি আমার মতো অসহায়ের পাশে অনেক মানুষ। আইজ পোরথম আলোর দেওয়া গাভি ও গোয়ালঘর পাইছি। এহন দুই বেলা ভাত খাইতে পারমু।’
২৭ জুলাই ২০০৬ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাছিমা বেগমের হাতে গাভি ও বাছুর তুলে দেওয়া হয়। এর আগে তাঁর বাড়িতে একটি গোয়ালঘর তৈরি করে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পাথরঘাটা উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাজা মিয়া। গত বছর প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে গাভি পাওয়া এসিডদগ্ধ হাসিনা বেগমও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
-
শেফালির নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে ১২ জুন ২০০৬ গোয়ালঘর, বাছুরসহ গাভি দেওয়া হলে আনন্দে অশ্রু ঝরিয়ে গাইবান্ধার শেফালি বলেন, ‘দুধ বেচি ওহন ট্যাকা জমামো। তাক দিয়া আরও গরু কিমমো। গরু বেশি হলে খামার দেমো। হামার ঘরে আর অভাব থ্যাকপ্যার নয়। ছোল-পোলক নেকাপড়া শিকি উকিল বানামো।’
শেফালি বলেন, ২০০৪ সালের ৯ এপ্রিল রাতে রামচন্দ্রপুর গ্রামের খলিল ও তাঁর লোকজন এসিড নিক্ষেপ করলে তাঁর শরীর ঝলসে যায়। প্রথমে তাঁকে পলাশবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকায় চিকিত্সা দেওয়া হয়।
এসিডদগ্ধ শেফালির জীবনের স্বপ্নগুলো প্রায় বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় যন্ত্রণা সইতে না পেরে শেফালি একসময় বলেছিলেন, ‘আমি বেঁচেও মরে গেলাম।’ কিন্তু সেই শেফালির কণ্ঠে এখন নতুন সুর। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
এ ব্যাপারে শেফালি বেগম বাদী হয়ে পলাশবাড়ী থানায় একটি মামলা করেন। এতে রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে খলিল মিয়া (২৮), আবদুল আউয়ালের ছেলে সাদেক আলী (২৬), দুদু মিয়ার ছেলে মিজানুর রহমান (২৫) ও মিনু মিয়াকে (২৩) আসামি করা হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
পাল্টাপাল্টি মামলায় তিনি এখন নিঃস্ব। সমাজের দু-একজন ছাড়া বেশির ভাগ মানুষ তাঁকে কোনো সাহায্য করেনি। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে প্রথম আলো সহায়ক তহবিল। তিনি এখন স্বনির্ভর হতে চান।
শেফালিকে সহায়তা হস্তান্তর উপলক্ষে গত সোমবার দুপুরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী-ঘোড়াঘাট সড়কের মেরিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মেরিরহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতলুবর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পলাশবাড়ী ইউএনও মিজানুর রহমান। তিনি শেফালির হাতে বাছুরসহ গাভি তুলে দেন।
শেফালির স্বামী আফজাল হোসেন প্রথম আলোকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাকে হুমকি দিচ্ছে। আমি আসামিদের বিচার চাই।’
-
আতুনা এখন একা নন
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার সীমান্তবর্তী বগুলাহাগী গ্রামের আতুনা বেগম নামে আরও এক এসিডদগ্ধ নারী প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে পুনর্বাসিত হলেন। তাঁকে দুটি উন্নত জাতের গাভি কিনে দেওয়া হয়েছে। নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে গোয়ালঘর। ১৩ জুন ২০০৬ তেঁতুলিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আবু হোরায়রা প্রধান অতিথি হিসেবে আতুনা বেগমের হাতে গাভি ও বাছুর তুলে দেন। অনুষ্ঠানে তাঁকে একটি গাভি এবং একটি বকনা বাছুর দেওয়া হয়। তৈরি করে দেওয়া হয় গোয়ালঘর।
এসিডদগ্ধ আতুনা বেগম বললেন, ‘বাড়ির পাশে একখণ্ড জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি রাতে আমার ওপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়। এসিডে আমার বুক, গলা ও মুখমণ্ডল ঝলসে যায়। প্রথমে তেঁতুলিয়া হাসপাতাল এবং পরে এ এস এফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়। পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করেই বিচারকাজ শুরু করেন। আসামিরা সবাই খালাস পেয়ে যায়।’
অনুষ্ঠানে কান্না জড়ানো কণ্ঠে আতুনা বেগম বলেন, ‘আমার সুখের সংসার ছিল। অথচ আজ আমি সহায়সম্বলহীন। আমার দুই ছেলে মানুষের বাড়িতে কাজ করে। সর্বনাশা এসিড আমার জীবনটাকে উলটপালট করে দিয়েছে। এ দুঃসময়ে প্রথম আলো আমার সঙ্গী হয়েছে। আমি এখন একা না। আমি কৃতজ্ঞ। আজ প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই গাভী লালন-পালন করে দুধ বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাতে পারব।’
যারা এসিড মারে তারা অমানুষ। এ অমানুষদের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সচেতনতার পাশাপাশি শক্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উদ্যোগে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বগুলাহাগী গ্রামের এসিডদগ্ধ আতুনা বেগমের জন্য আয়াজিত পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। এ উপলক্ষে ভজনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে প্রবীণ শিক্ষক আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ হয়।
-
স্বাবলম্বী আঁখি
‘আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি অত্যন্ত গরিব হলেও আমাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছিলেন। স্বপ্ন ছিল, লেখাপড়া করে বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। কিন্তু হঠাত্ পাশের গ্রামের মো. ময়নুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, তারপর বিয়ে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে ৮০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। বাবার পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব ছিল না। শুরু হয় নির্যাতন। বাড়ির সবাই মিলে আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত। খেতে দিত না। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, কেউ খবর নেয়নি। ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট রাত ১০টার দিকে আমার স্বামী, শ্বশুর মো. ওমর আলী, শাশুড়ি জুলেখা খাতুন যৌতুকের টাকা এনে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেন। আমি অপারগতা জানালে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার গায়ে এসিড ছুড়ে দেয়। এতে আমার ঘাড়, পিঠ, কোমরের নিচ পর্যন্ত ঝলসে যায়। আমি চিত্কার করতে থাকি। কেউ আমার সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। পরে পাশের বাড়ির লোকজন ছুটে এসে গায়ে পানি ঢালেন এবং আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ভুরুঙ্গামারী হাসপাতালে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই দিন রাতেই কুড়িগ্রাম হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিত্সার পর ঢাকায় চিকিত্সা হয়।’
প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উদ্যোগে পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বড় খাটকামারী গ্রামের এসিডদগ্ধ আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি দৃঢ়ভাবে এ কথাগুলো বলেন। ১৫ জুন ২০০৬ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া দুটি গাভি ও ধান ভেঙে চাল করে বিক্রির জন্য টাকা তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর জীবনের ভয়াবহ কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আর কেউ যেন এসিড সন্ত্রাসের শিকার না হন। এর যন্ত্রণা কী আমি জানি। কেউ আমাকে সহানুভূতি দেখায়নি। একবার সিদ্ধান্ত নিই, আত্মহত্যা করব। কিন্তু পারিনি। এখন প্রথম আলোর সহায়তা পেয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি। যত কষ্টই হোক, গাভি দিয়ে আয় করে আবার লেখাপড়া শিখব। স্বাবলম্বী হব।’
এ উপলক্ষে ভুরুঙ্গামারীর জয়মনিরহাট মডেল ইউনিয়ন পরিষদ ভবন অডিটোরিয়ামে এসিড সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। জয়মনিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান বাদল তালুকদারের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন ইউএনও মীর মো. নজরুল ইসলাম।
-
অনাহার ঘুচবে ফুলনাহারের
‘জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০০২ সালের ১৯ ডিসেম্বর এসিডদগ্ধ হই। এসিডে আমার হাত ও পিঠ ঝলসে যায়। প্রথমে কালীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকায় চিকিত্সা হয়। এ ঘটনায় আমি বাদী হয়ে মামলা করি। মামলার রায়ে প্রধান আসামি নিজামের ১০ বছর এবং মতি, হামিদ ও তোফাজ্জলের আট বছর করে কারাদণ্ড হয়।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উদ্যোগে এসিডদগ্ধ ফুলনাহার এ কথাগুলো বললেন। গত বৃহস্পতিবার ৮ নভেম্বর ২০০৬ উপজেলার বান্দেরকুড়া (সোনাহাট) এলাকার এসিডদগ্ধ ফুলনাহারের হাতে দুটি গাভি তুলে দেওয়া হয়।
গাভি পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফুলনাহার বলেন, ‘মামলা চালাতে গিয়ে আমার ছোট্ট সংসার শেষ হয়ে গেছে। আমি আর পারছিলাম না। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়। তবে এখন গাভি পেয়ে অনেকটা সাহস পেয়েছি। আশা করছি, আমার সমস্যা অনেকটা কমবে।’
-
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন গোপালগঞ্জের মুনিরা খানম
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার উজানী গ্রামের মুনিরা খানমকে প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। এককালীন ১০ হাজার ও মাসিক অনুদান হিসেবে এক হাজারসহ মোট ১১ হাজার টাকা ২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল তার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ও এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী সচেতনতা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে মুনিরা খানম বলেন, ‘আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী, একই গ্রামের শিমুল, ফোরকান, টনিক, লেলিনের প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় ২০০৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ঘরে ঢুকে আমাকে লক্ষ্য করে এসিড ছুড়ে মারে। এতে আমার ও মায়ের মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে যায়। এ সংক্রান্ত মামলার কয়েকজন আসামি জামিন মুক্তি পেয়ে আমার পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি করছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আজ প্রথম আলো সহায়ক তহবিল আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে, এ টাকায় আমার পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
এককালীন পাওয়া টাকা দিয়ে মুনিরার পরিবার তাকে পুনরায় স্কুলে ভর্তি ও বই-খাতা-কলমসহ যাবতীয় শিক্ষা-সরঞ্জাম কিনে দেবে। মাসিক এক হাজার টাকায় চলবে তার পড়ালেখার খরচ। যত দিন তিনি লেখাপড়া করবেন, প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে তাকে মাসিক এই অনুদান দেওয়া হবে।
শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ও এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে ৫ এপ্রিল ২০০৬ বিকেলে উজানী বিকেবি ইউনিয়ন হাইস্কুল মাঠে আলোচনা সভা হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কৃষিবিদ শ্যামল কান্তি বোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার কাজী মো. ফজলুল করিম।
মুনিরা খানমকে যারা এসিড মেরেছে, তাদের সামাজিকভাবে বর্জনের আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার কাজী মো. ফজলুল করিম বলেন, ‘আমি মুনিরার পাশে আছি, থাকব।’ খুচরা এসিড বিক্রিও বন্ধ করতে হবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে মুনিরা খানম তার ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা তুলে ধরে। এ সময় দর্শকসারিতে বসা অনেকের চোখে পানি চলে আসে। মুনিরার মামা ওয়াহিদুজ্জামান বক্তৃতা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
-
সবাইকে এ ধরনের নারীদের পাশে দাঁড়াতে হবে
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম সাধুহাটীতে ৪ এপ্রিল ২০০৬ আনুষ্ঠানিকভাবে রওফুন নাহারের হাতে দুটি গাভী তুলে দেওয়া হয়।
এসিডদগ্ধ রওফুন নাহার গাভী দুটি পেয়ে বললেন, ‘চৈত্র মাসে গরমের কারণে জানালা খুলে খাটের ওপর ঘুমিয়ে ছিলাম। জায়গা-জমি নিয়ে গ্রামের ডা. মালেক ও মতিয়ারের সঙ্গে বিরোধ ছিল। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল জানালা দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে এসিড ছোড়ে। এতে আমার চোখ, মুখ, বুক ও হাত ঝলসে যায়। আজ প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই গাভী লালন-পালন করে দুধ বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাতে পারব।’
গাভী হস্তান্তর ও এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কের সাধুহাটী মোড়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সদর ইউএনও পিয়ার মোহাম্মদ।
সাধুহাটী গ্রামের আবদুল লতিফের স্ত্রী রওফুন নাহার তিন বছর আগে এসিডদগ্ধ হন। পরে সমাজপতিদের চাপে তাঁকে মামলাও মিটিয়ে ফেলতে হয়। সমাজপতিরা চিকিৎসার খরচসহ বেঁচে থাকার জন্য এক লাখ ২৫ হাজার টাকা রওফুন নাহারকে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো টাকা দেওয়া হয়নি।
-
আর কোনো নারী এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হবে না
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভরতপুর দক্ষিণপাড়ার এসিড-সন্ত্রাসের শিকার লিলিমা খাতুনকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। ৩ এপ্রিল ২০০৬ প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে তিনটি গাভী দেওয়া হয়, নির্মাণ করে দেওয়া হয় একটি গোয়ালঘরও। এ উপলক্ষে ভরপতপুর দক্ষিণপাড়া ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ সমস্বরে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লিলিমার মতো আর কোনো মেয়ে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হবে না।’
প্রধান অতিথি জেলা পুলিশ সুপার মনজুর কাদের খান লিলিমার হাতে গাভী হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে লিলিমা এসিড নিক্ষেপের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি ও দুঃসহ বেদনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় অতিথিদের চোখও ভিজে ওঠে। লিলিমা বলেন, ‘সংসার, স্বামী কোনো কিছুই বোঝার মতো বয়স তখনো আমার হয়নি। এ সময় মা-বাবা প্রতিবেশী রুস্তমের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন। বিয়ের কিছু দিন পর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় ১৯৮৮ সালে আমার স্বামী ও তাঁর সহযোগী হজরত শ্বশুরবাড়িতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে আমার শরীরে এসিড ছোড়ে। দুই বোন, মাসহ একই সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলাম। পাষণ্ডরা কৌটায় করে এসিড ছুড়লে আমার মুখ, কান, বুক ও হাত ঝলসে যায়। কান ও মুখ ঝলসে যাওয়ায় এখনো আমার খেতে কষ্ট হয়। চোখে ভালো দেখতে পাই না। পরের জমিতে কামলা খাটা বাবা ঠিকমতো চিকিত্সা করাতে পারেন না। এ অবস্থায় বাবার সংসারে বোঝা হয়ে না থেকে রোজ সকালে ১৫-২০ জন শিশু-কিশোরকে আরবি শিক্ষা দিই। এতে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাই। এসিড নিক্ষেপের অপরাধে স্বামী রুস্তমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সম্প্রতি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগের পর রুস্তম মুক্ত হয়েছে। আজ প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই গাভী লালন-পালন করে দুধ বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাতে পারব।’
পুলিশ সুপার এলাকাবাসীকে লিলিমার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে লিলিমার থাকার ঘর করে দেওয়ারও আশ্বাস দেন। ইউএনও এসিড-সন্ত্রাস ও বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
-
বাংলা বর্ষবরণ আর বন্ধুত্বের কথা বললেন তাঁরা। আলোচনা হলো গণমাধ্যম ও নারী নিয়ে। গণমাধ্যমে নারীর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের ভাবমূর্তি নিয়েই কথা হলো বিস্তর। এরই মধ্যে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সারা যাকের এসিডদগ্ধ তাহমিনা ও মুক্তির হাতে তুলে দিলেন চরটি সেলাই মেশিন। প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের সহযোগিতায় সেলাই প্রশিক্ষণ পাওয়া চারজন এসিডদগ্ধ মেয়ে যেন নিজেদের উদ্যোগে কাজ শুরু করতে পারেন, ইনার হুইল ক্লাব তারই সূচনা করে দিল। ইনার হুইল ক্লাব (জেলা ৩২৮) আয়োজিত অনুষ্ঠানে আখতার জাহান, তাহমিনা, মুক্তি, রানু হাফিজ, সারা যাকের, নূর আয়শা চাকলাদার, সায়েনা মালিক, মিলি রহমান।
-
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কুমিল্লার ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী শারমিন বলে, ‘আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী, রাতে পড়াশোনা শেষে ঘুমিয়ে ছিলাম। সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে কর্মরত জামাল উদ্দিন ছুটিতে এসে (২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট) রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আমার গায়ে এসিড ছুড়ে মারে। ঝলসে যায় আমার মুখ-হাতসহ পুরো শরীর। দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা হয় আমার। এখনো অপরাধীদের কোনো বিচার হয়নি। আজ এ ঘটনায় প্রথম আলো আমার পাশে দাঁড়িয়েছে আমাকে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য। বই কেনার জন্য তারা শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছে। প্রথম আলোর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’ শারমিন বলে, ‘আমি এখন আর অসহায় নই। আমার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রথম আলো। ১০ হাজার টাকা পাওয়ায় বইপত্রসহ শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারব।’
১৮ মার্চ ২০০৬ দুপুরে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার কাকৈরতলা উচ্চবিদ্যালয়ে এক সুধী সমাবেশ এবং ‘রুখো এসিড বাঁচাও নারী’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসিডদগ্ধ শারমিন অনুষ্ঠানে বলে, ‘আমি পড়াশোনা করতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’ এসিড নিক্ষেপের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে শারমিন বলে, আর কোনো মেয়ে যেন এ ধরনের হামলার শিকার না হয়। এ সময় দর্শক সারিতে বসা শারমিনের বাবা আবদুল মতিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়ে যত দিন পড়তে চায়, তত দিন আমি পড়াব।’
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে এককালীন ১০ হাজার এবং মাসিক এক হাজার টাকাসহ ১১ হাজার টাকা শারমিনের হাতে তুলে দেন। শৈলিকা হ্যান্ডিক্র্যাফটসের সৌজন্যে শারমিনের হাতে এক সেট থ্রি-পিস তুলে দেন নারীনেত্রী দিলনাশি মোহসেন।
কাকৈরতলা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু মোহাম্মদের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংগড্ডা ইউপির চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান মজুমদার, নাঙ্গলকোট থানার ওসির প্রতিনিধি উপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুস সাত্তার মোল্লা প্রমুখ।
-
গরু পেয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী মনে হচ্ছে
পাবনার বেড়া উপজেলার নান্দিয়ারা গ্রামের এসিডদগ্ধ কামরুন নাহার ওরফে কাকলী বলেন, ‘আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়ে তাঁতশ্রমিক আনোয়ার হোসেন এসিড ছোড়ে। এতে আমার মুখ, গলা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। মামলায় গত বছর আসামি আনোয়ারকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু তাকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু আনোয়ার এবং তার লোকজন আমার পরিবারকে এখনো নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে।’
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে দেওয়া গোয়ালঘর, বাছুরসহ গাভি পেয়ে প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছিলাম, তখন প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। এর পর থেকে নিজেকে আর একা মনে হয়নি। গরু পেয়ে নিজেকে আজ স্বাবলম্বী মনে হচ্ছে।’
২০০২ সালের ৮ আগস্ট নান্দিয়ারা গ্রামের কামাল হোসেনের মেয়ে কাকলীদের বাড়িসংলগ্ন মাঠে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গোয়ালঘর, গাভি-বাছুর হস্তান্তর করা হয়। প্রবীণ সমাজসেবক শামছুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেড়া ইউএনও তরিকুল আলম।
কামরুন নাহারকে এসিড নিক্ষেপ মামলার আসামি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তারে জরুরি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে ইউএনও আশ্বাস দেন।
-
মারজিয়ার স্বপ্ন ও লক্ষ্য এখন উচ্চশিক্ষা
‘আমি এখন আর অসহায় নই। আমার পাশে দাঁড়িয়েছে প্রথম আলো। ১০ হাজার টাকা পাওয়ায় বইপত্রসহ শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারব। প্রতিমাসে এক হাজার টাকা পেলে প্রাইভেট পড়াটাও হবে।’ এসিডদগ্ধ মেধাবী ছাত্রী মুক্তা তাঁর অনুভূতির কথা তুলে ধরলেন এভাবে।
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার মেধাবী কলেজছাত্রী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। তহবিল থেকে ২৬ জুলাই ২০০৬ মারজিয়াকে এককালীন ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর পড়াশোনাকালে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে।
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মারজিয়া বলেন, ‘২০০১ সালের ১৩ জুন রাতে আমার বোনদের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলাম। রাতে ১২টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত জানালা দিয়ে আমার গায়ে এসিড ছোড়ে। আমার চিত্কারে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মা-বাবা ছুটে আসেন। ততক্ষণে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এতে আমার বুক, দুই হাত, বাঁ ঊরু ও শরীরের বেশ কিছু অংশ ঝলসে যায়। জীবনে এমন কোনো অন্যায় করিনি। আমি আজও জানি না, কী কারণে আমার গায়ে এসিড ছোড়া হলো।’
মারজিয়ার বাবা মাওলানা আবুল কাশেম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় ওকে এসিড মারা হয়। ১৫৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আমার মেয়ের রোল ছিল এক। জীবনে যে ক্লাসে দ্বিতীয় হয়নি, সেই মেয়ে দুই বছর স্কুলে যায়নি। চোখের সামনে আমার নির্দোষ মেয়ের মৃত্যুযন্ত্রণা দেখেছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আর কোনো মেয়ে যেন এভাবে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার না হয়।’
প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে ১১ জন এসিডদগ্ধ নারীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মারজিয়াকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে গত বুধবার সকালে কাপাসিয়ার টোকনয়নে শরীফ মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ কলেজে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অধ্যক্ষ তাজউদ্দিন আহমেদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন টোকনয়ন এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ ও কলেজ পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থলবন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শরীফ আতিকুর রহমান ও কাপাসিয়া থানার ওসি জাকারিয়া হোসেন।
-
বাকি জীবন আমি প্রথম আলোর সঙ্গে চলতে চাই
‘এসিডদগ্ধ হওয়ার পর আমি অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কীভাবে বাকি জীবন কাটবে, এ নিয়ে ছিল সংশয়। এ ঘটনার পর এলাকার অনেক মানুষ আমাকে সহযোগিতার পরিবর্তে নানা রকম অপবাদ দিতে থাকে। একসময় মনে হয়, আত্মহত্যা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই আমার জন্য। এ সময় প্রথম আলো আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। প্রথম আলো আমার চলার জন্য বাছুরসহ দুটি দুধাল গাভী দিয়েছে। এ গাভীর আয় থেকে আমি চলতে পারব। আশা করছি, আমার একমাত্র শিশুকন্যাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে পারব। এখন আমি আর একা নই। এসিড-সন্ত্রাস ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার উত্সাহ দিয়েছে প্রথম আলো। বাকি জীবন আমি প্রথম আলোর সঙ্গে চলতে যাই।’ এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে বাছুরসহ দুটি গাভী পেয়ে এভাবেই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বাটরা গ্রামের নার্গিস সুলতানা।
প্রসঙ্গত, ২০০০ সালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বাটরা গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে নার্গিস সুলতানা ভালোবেসে বিয়ে করেন একই গ্রামের আফাজদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম। বিয়ের পর তাঁদের একটি কন্যা সন্তান হয়। কিন্তু নার্গিসের শ্বশুর-শ্বাশুড়ি তাঁকে মেনে না নেওয়ায় তিনি আদালতে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেন তাঁর স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর স্বামী ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে রাতে তাঁর গায়ে এসিড মেরে ঝলসে দেন। এতে তাঁর তিন মাসের শিশুকন্যা পপি আহত হয়। এসিডদগ্ধ শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে নার্গিস এখনো বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। নার্গিস তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ‘আদালতে আমি বিচার পাইনি, আমি আপনাদের কাছে বিচার চাই।’
-
এসিডের বীভত্স চেহারা নিয়ে আর যেন কাউকে মানুষের সামনে দাঁড়াতে না হয়
‘আর যেন একটি মুখও এসিডে ঝলসে না যায়। আর যেন কাউকে আমাদের মতো এসিডদগ্ধের যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়। এসিডের বীভত্স চেহারা নিয়ে আর যেন কাউকে মানুষের সামনে দাঁড়াতে না হয় বিচার কিংবা সহযোগিতার জন্য।’ ২০০৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কথাগুলো বললেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নওয়াকাটি গ্রামের এসিডদগ্ধ খোদেজা বেগম। দুষ্কৃতকারীদের ছুড়ে দেওয়া এসিডে তিনি, তাঁর শিশুকন্যা সোনালী ও স্বামী নূর ইসলাম ঝলসে যান। এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল থেকে গতকাল সোনালীকে সাড়ে ১০ শতক জমি দেওয়া হয়। এই জমির দলিল তুলে দেওয়া হয় খোদেজার হাতে। দলিল পেয়ে খোদেজা বলেন, প্রথম আলো তাঁদের পরিবারকে সাহসী করে তুলেছে নতুন করে বাঁচার জন্য। জমির দলিল প্রদান উপলক্ষে তালা উপজেলার মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। খোদেজার হাতে দলিল তুলে দেন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা মোহর আলী।
তালা উপজেলার নওয়াকাটি গ্রামের নূর ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী খোদেজা বেগম তাঁদের ১৮ দিন বয়সী শিশুকন্যা সোনালীকে নিয়ে ২০০১ সালের ২৮ নভেম্বর রাতে নিজেদের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। খোলা জানালা দিয়ে দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর এসিড ছুড়ে মারে। এতে সোনালী ও খোদেজার চোখ, মুখ, কানসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ এবং নূর ইসলামের কাঁধ ও বুক ঝলসে যায়। ওই রাতেই তাঁদের খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই দিন পর চিকিত্সার জন্য তাঁদের ঢাকায় নেওয়া হয়। দীর্ঘ চিকিত্সায় সোনালী বেঁচে গেলেও তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে ডান চোখ। খোদেজারও ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া মুখমণ্ডল তাঁকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়। পুলিশ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলার রায়ে সব আসামি খালাস পেয়ে যায়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন।
সোনালীর বাবা নূর ইসলাম বলেন, এসিড ছোড়ার আগের দিন প্রতিবেশী মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাঁশকাটা নিয়ে তাঁদের ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে তাঁদের ওপর এসিড ছুড়ে মারা হয়।
আপনি দেখছেন "এসিডদগ্ধদের পাশে প্রথম আলো" এ্যালবামের ছবি।
[+] এ এ্যালবাম সম্পর্কিত তথ্য