
যুদ্ধজয়ী সেনাপতিকেও ক্লান্ত দেখায়। বিজয়ের গৌরবময় হাসির ঝলকানির ফাঁকে ফাঁকে ঝিলিক দিয়ে যায় রণক্লান্ত অবয়ব। কিন্তু সেদিন তাঁকে এতটুকু ক্লান্তির ধুলো স্পর্শ করেনি। যুদ্ধ থেকে ফিরেই যে তিনি নেমে পড়ছিলেন আরেকটি যুদ্ধে। ব্যাট নামের তলোয়ার হাতে নেমেছেন ২২ গজি দুর্গে। অদৃশ্য এক তুষারের মতো ধবধবে সাদা ঘোড়ায় চেপে যেন হাজির হয়েছেন মঞ্চে। তাঁকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হাজারো মানুষ। তুমুল করতালির বৃষ্টি। মুহুর্মুহু স্লোগানে কেঁপে উঠছে চারদিক।
যুবরাজ, রাজা হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা এক জাতলড়াকু সব সংশয়, সন্দেহ আর প্রশ্নের দেয়াল ভেঙে দিয়ে গত বছর সেপ্টেম্বরে ফিরে এসেছেন ক্রিকেট মাঠে। ২০ মাস পর নেমেছেন ক্রিকেট মাঠে। ভারতের বিশাখাপত্তনমে সেদিন স্রেফ একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ছিল সেটি। ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড। কিন্তু ক্রিকেটের জমিন ছাড়িয়ে সেটি হয়ে উঠল আবেগময় প্রত্যাবর্তনের এক রূপকথা। ক্যানসারকে জয় করে ফেরা এক মানুষের আখ্যান! সেদিনের ম্যাচটায় দল হারলেও তিনি নিজে দারুণ খেলেছেন। দলের সেই পরাজয় যেন মনে করিয়ে দিতে চেয়েছে, মানুষের জীবনের সত্যিকারের রূপকথাগুলো এমনই। প্রাপ্তির সুখের সঙ্গে অপ্রাপ্তির হাহাকারও এসে একই মোহনায় মিলে যায় বলেই জীবন এত সুন্দর।
সেদিন ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত যুবরাজ জীবনের এই বড় দর্শনটির কথাও বলেছেন উচ্চকিতভাবে, ‘কোনো বর্ণনাই বোঝাতে যথেষ্ট নয় কতটা কষ্টের ছিল এই লড়াই। কঠিন এক যুদ্ধ। আমি গর্বিত যে আজ আবার মাঠে ফিরতে পেরেছি।’ আসলেই এ এক কঠিন লড়াই। যে লড়াইয়ে জেতার জন্য শুধু চিকিৎসা নয়, লাগে প্রচণ্ড মানসিক জোরও। যুবরাজের অনেক দিনের বন্ধু হরভজন সিং তখন বলছিলেন, ‘এটাকেই বলে সত্যিকারের কামব্যাক। যুবির চেয়ে ক্রিকেটে আর বড় কোনো প্রেরণা এখন নেই। ওর সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে থাকতে পারাটাও আমার জন্য সম্মানের।’
গত দুই বছর অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন যুবরাজ। ২০১১ সালের এপ্রিলে ভারতকে এনে দিয়েছেন পরম আরাধ্যের বিশ্বকাপ। সেই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। কিন্তু ওই বছর নভেম্বরেই জানা গেল, ক্যানসার বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে।
তাঁর এই অসুখ নিয়ে লুকোছাপার চেষ্টা হয়েছে। এমন করলে যা হয়, চলেছে কানাঘুষা। সন্দেহটা চাউর হয়ে গিয়েছিল ২০১১ সালের নভেম্বরে, যখন খবর বেরোল, ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক খেলেছেন ফুসফুসে গলফ বল সাইজের এক টিউমার নিয়ে। ‘নির্দোষ’ টিউমার নাকি ক্যানসার—এ নিয়ে কদিন চলল কানাকানি। যুবরাজের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হলো, ক্ষতিকর কিছু নয়, ওষুধেই সেরে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যিটা আড়াল করা গেল না। ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন যুবরাজ। বোস্টনের ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চলল চিকিৎসা।
চিকিৎসকদের অন্যতম ড. নীতেশ রোহাতগি অবশ্য প্রথম থেকেই বলে এসেছেন এটা গুরুতর কিছু নয়। কয়েকটি কেমো নিলেই সেরে উঠবেন যুবরাজ। তা ছাড়া রোগটা খুব বেশি ছড়িয়ে পড়েনি। ফলে ভয়ও কম। ড. নীতেশ এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০১২ সালের মে মাসের মধ্যেই ক্রিকেটে ফিরবেন যুবরাজ। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী আর লাখো-কোটি ভক্তের প্রার্থনা বিফলে যায়নি। গত বছর এপ্রিলে দেশে ফেরেন সুস্থ যুবরাজ। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সেপ্টেম্বরেই ফিরে আসেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। এত তাড়াতাড়ি তাঁর ক্রিকেটে ফেরা অনেককেই চমকে দিয়েছিল। খোদ যুবরাজই বলেছিলেন, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না আবার খেলতে পারছি। মাত্রই কিছুদিন আগেও সিঁড়ির চারটি ধাপ পেরোতেও কষ্ট হচ্ছিল।’
কিন্তু যত সহজে বলে ফেলা গেল, এতটা সহজ নিশ্চয়ই ছিল না তাঁর এই লড়াই। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন, প্রতিটা কেমোথেরাপি কী অসহ্য যন্ত্রণাও নিয়ে আসে সঙ্গে করে। শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যায় যন্ত্রণার ঝড়। তার ওপর ছিল বেঁচে থাকা নিয়ে প্রতি মুহূর্তের অনিশ্চয়তা, যতই অভয় দিক ডাক্তাররা। যুবরাজ দারুণ প্রত্যয়ে সেই দিনগুলো পার করেছেন।
ক্যানসার তাঁকে জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরুর সুযোগ করে দিয়েছে। শুরুর সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেছেন, ‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে এই লড়াই আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটা আমার জন্য ছিল যুদ্ধজয়ের মতো। আমাকে ডাক্তাররা বলেছিলেন আমার কিডনি, লিভারসহ আরও কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যেতে পারে। এটা মেনে নেওয়াই ছিল কঠিন। আমি জানতাম না বেঁচে থাকতে পারব কি না। এমন সময়েও নিজের লড়াইয়ের আস্থাটা কখনো হারাইনি।’
যুবরাজ জানিয়েছেন, ক্যানসার তাঁকে শিখিয়েছে জীবনে বেঁচে থাকাটাই অনেক বড় ব্যাপার, ‘আমি ইতিবাচক ছিলাম। ক্রিকেটই আমার জীবন। ক্যানসারের আগে আমি শুধু ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতাম। উদ্বিগ্ন হতাম। কিন্তু এখন আমার ভাবনা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন আমি স্বাভাবিকভাবে খেতে পেরে আর শ্বাস নিতে পেরেই খুশি। জীবন ফিরে পাওয়াটাই আমার কাছে বড় আনন্দ।’
না, যুবরাজের লড়াইটা এখনো শেষ হয়নি। ক্রিকেট মাঠে তো লড়ছেনই। যুবরাজ লড়তে চান ক্রিকেট মাঠের বাইরেও। এই যুদ্ধে তাঁর প্রতিপক্ষ ক্যানসার। এ নিয়ে অনেক কাজ করার পরিকল্পনা আছে। সত্যি সত্যিই এটিকে যুদ্ধ হিসেবে নিয়েছেন। আর এই যুদ্ধে ফলাফল একটাই—যুবরাজের জয়!